সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
২২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্যাটি লিভারের নীরব বিস্তার, যে পাঁচটি শারীরিক সতর্ক সংকেত কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম

ফ্যাটি লিভারের নীরব বিস্তার, যে পাঁচটি শারীরিক সতর্ক সংকেত কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় একটি নীরব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ফ্যাটি লিভার বা যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমার সমস্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত নীরবে বিকশিত হতে থাকে।

 

বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তি টেরই পান না যে তার যকৃতে চর্বি জমছে। দৃশ্যমান কোনো লক্ষণ না থাকায় এই শারীরিক জটিলতাটি অনেক সময় অলক্ষ্যেই গুরুতর আকার ধারণ করে। তবে যকৃতের ক্রমাগত ক্ষতির ফলে মানবদেহে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে, যা অবহেলা করা উচিত নয়।

 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকেতগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা গেলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো এবং চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। শরীরে অস্বাভাবিক মাত্রায় ক্লান্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা অনুভূত হওয়া যকৃতের সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ।

 

পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি ক্লান্তি দূর না হয়, তবে তা চিন্তার বিষয়। আমেরিকান লিভার ফাউন্ডেশনের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি হলো ‘মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’-এর একটি প্রধান সতর্ক সংকেত, যা পূর্বে ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ নামে পরিচিত ছিল।

 

যকৃতের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা যখন কমতে শুরু করে, তখন শরীরে শক্তির ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে প্রাত্যহিক সাধারণ কাজগুলোকেও আগের চেয়ে অনেক বেশি শ্রমসাধ্য বলে মনে হতে পারে। তবে অপর্যাপ্ত ঘুম, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা কিংবা মানসিক চাপের কারণেও অবসাদ আসতে পারে, তাই শুধু ক্লান্তি থাকলেই ফ্যাটি লিভারের চূড়ান্ত রূপ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

 

যকৃৎ মানবদেহের পাঁজরের ঠিক নিচে, পেটের ওপরের ডান দিকে অবস্থান করে। চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী ‘জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে জানা যায়, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত বেশ কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পেটের উপরের ডান অংশে অস্বস্তি বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

 

যকৃতে চর্বি জমে সেটি আকারে বড় হয়ে গেলে বা প্রদাহের সৃষ্টি হলে আশেপাশের স্নায়ুতে চাপ পড়ে, যার ফলে ব্যথার উদ্ভব হয়। আগে থেকেই যকৃতে চর্বি জমার সমস্যা থাকলে এবং পেটের ডান দিকের ওপরে ক্রমবর্ধমান ব্যথা শুরু হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।

 

অবশ্য পেটের ওই অংশে ব্যথার পেছনে পিত্তথলির পাথর বা হজম প্রক্রিয়ার জটিলতাও অন্যতম কারণ হতে পারে। ত্বক কিংবা চোখের সাদা অংশ হলুদ বর্ণ ধারণ করা, যা জন্ডিস নামে পরিচিত, যকৃতের মারাত্মক ক্ষতির একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট লক্ষণ।

 

মানুষের রক্তে থাকা পুরোনো লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে প্রাকৃতিকভাবেই ‘বিলিরুবিন’ নামক হলদেটে উপাদানের সৃষ্টি হয়। সুস্থ যকৃৎ নিয়মিত বিলিরুবিন ছেঁকে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু যকৃৎ যখন কার্যক্ষমতা হারিয়ে বিলিরুবিন প্রক্রিয়াজাত করতে ব্যর্থ হয়, তখনই তা রক্তে মিশে ত্বক ও চোখকে হলুদ করে তোলে।

 

সাধারণ ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে জন্ডিস খুব একটা দেখা যায় না, বরং এটি যকৃতের বড় ধরনের কর্মহীনতার জোরালো ইঙ্গিত বহন করে। চোখ হলুদ হওয়ার পাশাপাশি গাঢ় রঙের প্রস্রাব বা ফ্যাকাশে মল নির্গত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

 

যকৃতের রোগ যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন তা মানবদেহের তরল ও প্রোটিনের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে শরীরে অস্বাভাবিক ফোলাভাব বা পানি জমার সমস্যা দেখা দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে তার পা এবং গোড়ালির চারপাশে এমন ফোলাভাব লক্ষ্য করতে পারেন।

 

রোগের মাত্রা আরও গুরুতর হলে পেটের ভেতরের গহ্বরে বিপুল পরিমাণ তরল জমতে শুরু করে, যার কারণে পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে ‘অ্যাসাইটিস’ বলা হয়। হৃদরোগ ও কিডনির অকার্যকারিতার কারণেও ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।

 

তবে যকৃতের রোগ থাকা অবস্থায় নতুন করে পা বা পেট ফুলে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে তা নিছক ওজন বৃদ্ধি হিসেবে অবহেলা করা বোকামি হতে পারে। স্বাভাবিক রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনগুলো মূলত যকৃতেই উৎপন্ন হয়ে থাকে। সুস্থ যকৃৎ যেকোনো রক্তপাত দ্রুত বন্ধ করতে এই প্রোটিনগুলোর সরবরাহ নিশ্চিত করে।

 

কিন্তু যকৃতের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হলে শরীরের জন্য এই প্রোটিনগুলো তৈরির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। এর ফলে শরীরে সামান্য আঘাতেই খুব সহজে কালশিটে পড়া বা অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে। সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই যদি বারবার কালশিটে দাগ পড়ে বা নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়, তবে তা যকৃতের অকার্যকারিতার লক্ষণ হতে পারে।

 

এই উপসর্গগুলোর কোনো একটি দেখা দিলেই যে যকৃতের অবস্থা চূড়ান্ত পর্যায়ে খারাপ, বিষয়টি এমন নয়। তবে শারীরিক এই সংকেতগুলোকে উপেক্ষা না করে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রত্যেক সচেতন মানুষের জন্যই আবশ্যক।