প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুরু করে রাতের বিশ্রামে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তির এই অবাধ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ মানুষের জীবনে এক অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের যে অনাকাঙ্ক্ষিত তুলনা চলে, তা আধুনিক যুগের মানুষের মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষকরা গভীর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছেন যে, দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজের যে বাহ্যিক বা শারীরিক চাপ থাকে, তার চেয়েও মানুষের মস্তিষ্কে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত তথ্য প্রবেশের বিষয়টি অনেক বেশি ক্ষতিকর।
চারপাশের সবকিছু নিয়ে সার্বক্ষণিক অতিরিক্ত সচেতন থাকা এবং প্রতিটি ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানার যে অদম্য কৌতূহল, তা মানুষকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অবসাদগ্রস্ত করে তুলছে।
বিবর্তনবিদ্যা এবং মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক ও মন মূলত একটি নির্দিষ্ট এবং অপেক্ষাকৃত ছোট সামাজিক পরিমণ্ডলের ভেতরে থাকা সমস্যা মোকাবিলার উপযোগী করে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছিল।
আদিম যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের পূর্ব পর্যন্ত মানুষ কেবল তার চারপাশের ছোট গোষ্ঠীর খবরাখবর রাখত। কিন্তু বর্তমান এই চরম উৎকর্ষের যুগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন হাজার মাইল দূরের কোনো দূরবর্তী অঞ্চলের রাজনৈতিক সংকট, যুদ্ধবিগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে অপরিচিত কোনো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অভাবনীয় সাফল্য বা বিলাসবহুল ভ্রমণের চোখধাঁধানো দৃশ্য সার্বক্ষণিকভাবে আমাদের চোখের সামনে হাজির হচ্ছে।
এর ফলে নিজের বাস্তব ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কোনো ধরনের যোগসূত্র না থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ অবচেতনভাবেই পৃথিবীর বহু ঘটনার ও বিষয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিক চাপ নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে।
এই অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্য মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করছে এবং মানুষকে এক ধরনের অজানা উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার মধ্যে নিমজ্জিত করছে। এর পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব, যা মানুষের মানসিক ভার আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এসব মাধ্যমে প্রতিনিয়ত অন্যের আপাত সফল, সুখী ও চাকচিক্যময় জীবনের সঙ্গে নিজের সাধারণ বাস্তবতার ক্রমাগত তুলনা চলতে থাকে। মনস্তাত্ত্বিকরা বারবার মনে করিয়ে দেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত মানুষ তার জীবনের কেবল বাছাই করা, সবচেয়ে সুন্দর ও ইতিবাচক মুহূর্তগুলোই প্রদর্শন করে থাকে।
এটি কখনোই একজন মানুষের সম্পূর্ণ জীবনের প্রকৃত প্রতিচ্ছবি হতে পারে না। সেখানে মানুষের ব্যর্থতা, দুঃখ, গ্লানি বা সংগ্রামের গল্পগুলো সযত্নে আড়াল করে রাখা হয়। কিন্তু এই কৃত্রিম ও সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনায় জড়িয়ে পড়ার ফলে ব্যক্তি নিজের সক্ষমতা, প্রাপ্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে একধরনের অযাচিত এবং গভীর অতৃপ্তিতে ভুগতে শুরু করে।
এই অমূলক অতৃপ্তি থেকেই জন্ম নেয় হতাশা, যা ধীরে ধীরে মানুষের স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাসকে তলানিতে নিয়ে যায়। মানসিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষক ও চিকিৎসকদের মতে, আধুনিক জীবনের এই ভয়াবহ মানসিক ক্লান্তি ও অবসাদ থেকে নিস্তার পেতে হলে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছু মৌলিক এবং কঠোর শৃঙ্খলা আনা একান্ত প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ পরিহার করতে হবে। এক মাসের বা এক বছরের দীর্ঘমেয়াদি দুশ্চিন্তায় একবারে ভারাক্রান্ত না হয়ে, সময়কে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কেবল আজকের দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অবশ্য করণীয় কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া উচিত।
পাশাপাশি, বাস্তবতার নিরিখে একজন মানুষকে এটি বুঝতে হবে যে, পৃথিবীর কোন বিষয়টি তার নিজের নিয়ন্ত্রণের ভেতরে রয়েছে এবং কোনটি কেবলই একটি সাধারণ তথ্যমাত্র। এই দুইয়ের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে অনুধাবন করে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের মানসিক দায় বা বোঝা নেওয়া থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত রাখা সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মানসিক প্রশান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট এবং অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা নির্ধারণ করার জন্য বিশেষজ্ঞরা জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন। সারাদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে সামাজিক মাধ্যমের খবরের পেছনে না ছুটে, দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় নিজেকে এসব মাধ্যম থেকে পুরোপুরি দূরে রাখতে হবে।
একে দৈনন্দিন জীবনের একটি প্রযুক্তিগত বিরতি বলা যেতে পারে। বিশেষ করে কর্মঘণ্টা শেষে নিজের এবং পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত একান্ত নিজস্ব সময়কে এসব ভার্চুয়াল মাধ্যম থেকে আলাদা করাই মনোযোগ ও স্বস্তি পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি।
সবকিছু একসঙ্গে সামলানোর অসম্ভব মানসিকতা পরিহার করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় তথ্য, নেতিবাচক সংবাদ এবং অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার যে ক্ষতিকর অভ্যাস, তা জীবন থেকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়াই মানসিক অবসাদ কাটানো এবং একটি সুস্থ, সুন্দর ও প্রশান্তিময় জীবনযাপনের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।