সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সকালের যেসব সাধারণ ভুলে নীরবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যকৃৎ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

সকালের যেসব সাধারণ ভুলে নীরবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যকৃৎ
ছবি : Collected

ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ে চুমুক দেওয়া, সকালের নাশতা না করেই কর্মস্থলের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়া কিংবা বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় মুঠোফোনের পর্দায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো-আধুনিক নাগরিক জীবনের অত্যন্ত সাধারণ ও পরিচিত কিছু দৃশ্য।

 

আপাতদৃষ্টিতে দৈনন্দিন জীবনের এসব সাধারণ আচরণকে সম্পূর্ণ নির্দোষ মনে হলেও প্রতিদিনের এই রুটিনই মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যকৃতের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, মানুষের শরীর সুস্থ রাখতে যকৃৎ একাই বহুবিধ জটিল কাজ নিরলসভাবে করে যায়।

 

আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, তা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান প্রক্রিয়াজাত করা, শরীরের চর্বি ও শর্করার বিপাক নিয়ন্ত্রণ করা এবং বিভিন্ন ওষুধ বা ক্ষতিকর উপাদান শরীর থেকে নিষ্কাশন করার মতো অত্যন্ত জরুরি কাজগুলো সার্বক্ষণিক পরিচালনা করে এই অঙ্গটি।

 

তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যকৃতের জটিল কোনো অসুখ দেখা দিলেও প্রাথমিক পর্যায়ে তার স্পষ্ট কোনো লক্ষণ শরীরে প্রকাশ পায় না। ফলে ভেতরে ভেতরে এই অঙ্গটি বিকল হতে শুরু করলেও মানুষ তা টেরই পায় না।

 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন সকালের রুটিনে অতি সাধারণ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই যকৃৎকে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতির হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। ওজন কমানোর তীব্র তাড়না কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উপবাস বা না খেয়ে থাকার নিয়ম মানতে গিয়ে আধুনিক যুগে অনেকেই নিয়মিত সকালের নাশতা বাদ দিয়ে থাকেন।

 

কিন্তু দীর্ঘ সময় পেট খালি রাখার এই অভ্যাস সবার শরীরের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। রাতের দীর্ঘ বিরতির পর সকালে রক্তে শর্করার কাঙ্ক্ষিত মাত্রা বজায় রাখতে যকৃৎকে বাড়তি কাজ করতে হয়। এ সময় শরীরে সংরক্ষিত থাকা গ্লাইকোজেন ভেঙে শর্করার ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে যকৃতের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়।

 

তাই সকালে তেমন একটা ক্ষুধা অনুভব না করলেও একেবারে অভুক্ত না থাকার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। তারা মনে করেন, সকালে অন্তত ডিম সেদ্ধ, বাদাম কিংবা চিয়া বীজের মতো পুষ্টিকর ও হালকা খাবার গ্রহণ করা উচিত। আবার যারা সকালে খাবার খান, তাদের অনেকেই দিনের সূচনাতেই অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাদ্য গ্রহণ করেন, যা যকৃতের জন্য সমান মাত্রায় ক্ষতিকর।

 

সকালের খাদ্যতালিকায় থাকা মিষ্টি শস্যজাতীয় খাবার, ফলের নির্যাস বা মিষ্টিজাতীয় মিশ্রণ মাখানো পাউরুটি বা প্রক্রিয়াজাত খাবারে ব্যাপক মাত্রায় ফ্রুক্টোজ নামক উপাদান থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্রুক্টোজের এই অতিরিক্ত ব্যবহার সরাসরি যকৃতে চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে, যা কালক্রমে যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমার মতো বড় ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়।

 

অনেকেই সাধারণ চিনির বিকল্প হিসেবে মধু বা প্রাকৃতিক মিষ্টি ব্যবহার করলেও তা চিনির ক্ষতি থেকে শরীরকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারে না বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আরও একটি মারাত্মক ভুল হলো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খালি পেটে বিভিন্ন খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন, পুষ্টি পরিপূরক বা ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ করা।

 

এই প্রবণতা যকৃতের বিপাক প্রক্রিয়ায় মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন চটকদার নামে প্রচলিত তথাকথিত ভেষজ পরিশোধক পণ্যগুলো যকৃতের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

 

চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া নিজে থেকে একাধিক পরিপূরক ওষুধ গ্রহণ এড়িয়ে চলার কঠোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বর্তমান সময়ে শরীর বিষমুক্ত করার দাবি নিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বিভিন্ন পানীয়-যেমন লেবু, ভিনেগার, হলুদ বা রসুনের মিশ্রণ নিয়মিত পান করাকেও ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন গবেষকরা।

 

তাদের মতে, যকৃৎ নিজেই শরীরের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিশোধক ব্যবস্থা এবং শরীর প্রাকৃতিকভাবেই নিজের বর্জ্য অপসারণে সম্পূর্ণ সক্ষম। কৃত্রিম এসব পানীয় বা পণ্যের অতিরিক্ত ভেষজ উপাদান যকৃতের সেই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক কার্যক্ষমতাকে উল্টো নষ্ট করে দিতে পারে।

 

তাই তথাকথিত বিষমুক্তকরণ পণ্যের পেছনে না ছুটে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করা ও সুষম খাদ্যের ওপর আস্থা রাখাই বেশি জরুরি। যকৃতের সুস্থতার সঙ্গে কেবল সকালের অভ্যাসই নয়, জড়িয়ে আছে ঘুমের রুটিন ও শারীরিক সক্রিয়তার বিষয়টিও।

 

সকালে ঘুম ভাঙার পর দীর্ঘক্ষণ বিছানায় অলস সময় কাটানো এবং কোনো ধরনের কায়িক পরিশ্রমে যুক্ত না হওয়া মানুষের সামগ্রিক বিপাকপ্রক্রিয়াকে দারুণভাবে ব্যাহত করে। যকৃতের স্বাস্থ্য সক্রিয় রাখতে ব্যায়ামাগারে গিয়ে ভারী শরীরচর্চার কোনো প্রয়োজন নেই; ঘুম থেকে ওঠার পর মাত্র দশ মিনিটের নিয়মিত হাঁটা বা হালকা শারীরিক কসরতই শরীরকে কার্যকরভাবে সচল করতে সাহায্য করে।

 

এই সকালের সুস্থতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে আগের রাতের জীবনযাত্রাও। রাতে দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া, ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত বা ভারী খাবার খাওয়া এবং গভীর রাত পর্যন্ত ডিজিটাল যন্ত্রের নীল আলোয় সময় কাটানো মানুষের শরীরের হরমোন ও শর্করার ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে।

 

ঘুমের এই ঘাটতি ও অনিয়ম সরাসরি যকৃতের বিপাক ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যকৃতের সঠিক যত্ন নেওয়ার জন্য কোনো ব্যয়বহুল পুষ্টি পরিপূরক বা অলৌকিক পানীয়ের একেবারেই প্রয়োজন নেই।

 

প্রতিদিন পরিমিত ও সুষম আহার গ্রহণ, রাতে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম, নিয়মিত স্বাভাবিক শারীরিক সক্রিয়তা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অযাচিত ওষুধ এড়িয়ে চলার মতো মৌলিক ও সুশৃঙ্খল অভ্যাসের মাধ্যমেই এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিকে দীর্ঘ মেয়াদে সম্পূর্ণ সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখা সম্ভব।