শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বয়স অনুপাতে শিশুর উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না এবং বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে করণীয়

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম

বয়স অনুপাতে শিশুর উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না এবং বিকাশ বাধাগ্রস্ত হলে করণীয়
ছবি: সংগৃহীত

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্যতম প্রধান নির্দেশক হলো তার বয়স অনুযায়ী সঠিক ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া। আধুনিক নাগরিক জীবনে অনেক অভিভাবকই একটি সাধারণ অভিযোগ করে থাকেন যে, তাদের সন্তান পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ করছে না, যার ফলে বয়স অনুপাতে কাঙ্ক্ষিত ওজন ও উচ্চতা-উভয় ক্ষেত্রেই শিশুটি পিছিয়ে পড়ছে।

 

আবার এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রও সমাজে বিরল নয়। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, বয়স ও বয়সের তুলনায় তাদের ওজন অত্যধিক বেশি হলেও, সেই অনুপাতে উচ্চতা একেবারেই বাড়ছে না। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর সুস্থতার জন্য ওজন এবং উচ্চতার মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য।

 

প্রতিটি বয়সের জন্যই উচ্চতা ও ওজনের একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি রয়েছে। সন্তান সেই নির্ধারিত মাপকাঠির আওতায় সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কি না, তা প্রতিনিয়ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রত্যেক সচেতন অভিভাবকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

 

মানবদেহের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী, উচ্চতা বৃদ্ধির হার ছেলে ও মেয়েদের ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা ভিন্ন হয়ে থাকে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ছেলেদের ক্ষেত্রে সাধারণত আঠারো থেকে বিশ বছর বয়স পর্যন্ত উচ্চতা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে।

 

এর মধ্যে বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে, বিশেষ করে তেরো থেকে ষোলো বছর বয়সের মধ্যে ছেলেদের উচ্চতা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, মেয়েদের শারীরিক বৃদ্ধির ধরনটি একটু আলাদা। তাদের ক্ষেত্রে সাধারণত ষোলো থেকে আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত উচ্চতা বাড়ে।

 

তবে মেয়েদের শারীরিক চক্র বা ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর থেকে উচ্চতা বৃদ্ধির এই হার প্রাকৃতিকভাবেই ধীর হতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। যদিও ব্যক্তিভেদে এই বয়সসীমা ও অনুপাতের সামান্য পার্থক্য হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়।

 

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, কেবল উচ্চতার দিকে নয়, বরং শিশুর সার্বিক শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির দিকে অভিভাবকদের সর্বাধিক জোর দিতে হবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ সুষম খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা এবং নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

 

অনেক সময় দেখা যায়, বয়স স্বাভাবিক নিয়মে বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত হারে শিশুর উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুতর কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জিনগত বা বংশগত প্রভাব।

 

এছাড়া শিশুর শরীরে যদি শারীরিক বৃদ্ধির হরমোন বা গ্রোথ হরমোনের মারাত্মক ঘাটতি থাকে, তবে তা উচ্চতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি, দৈনন্দিন খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, খাদ্যপ্রাণ বা ভিটামিন ডি এবং দস্তার মতো অত্যাবশ্যকীয় খনিজ উপাদানের ঘাটতি থাকলেও শিশুর হাড়ের সঠিক গঠন ও বৃদ্ধি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

 

অনেক শিশুর ক্ষেত্রে একেবারে ছোটবেলা থেকেই থাইরয়েড গ্রন্থির নানাবিধ জটিলতা কিংবা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগ লুকিয়ে থাকতে পারে, যা শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে মাঝপথেই থামিয়ে দেয়।

 

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা দৃঢ়ভাবে বলছেন যে, শিশুর শারীরিক সমস্যা যেমনই হোক না কেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক পুষ্টিমান সম্পন্ন খাবার গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট কিছু নিয়মমাফিক শরীরচর্চার অভ্যাস করালে এই শারীরিক বৃদ্ধির স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্পূর্ণভাবে সম্ভব।

 

শিশুর উচ্চতা ও শারীরিক গঠনে সহায়তা করার জন্য বেশ কিছু কার্যকর ও পরীক্ষিত শরীরচর্চা বা ব্যায়াম রয়েছে, যা নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়। এর মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সহজ একটি ব্যায়াম হলো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দড়িলাফ বা রজ্জু লম্ফন অনুশীলন করা।

 

নিয়মিত দড়িলাফের ফলে শিশুর শরীরের অতিরিক্ত ওজন যেমন নিয়ন্ত্রণে থাকে, তেমনি পায়ের নিচের অংশের পেশিগুলো অত্যন্ত সুগঠিত হয়, যা পরোক্ষভাবে উচ্চতা বৃদ্ধিতে দারুণ সহায়তা করে। এছাড়া ঊর্ধ্ব তাড়াসন নামের আরও একটি বিশেষ যোগব্যায়াম শারীরিক বৃদ্ধিতে চমৎকার কাজ করে।

 

এই ব্যায়ামটি করার জন্য প্রথমে মাদুর বা শতরঞ্জির ওপর মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হয়। এ সময় দুই পায়ের পাতার মধ্যে অন্তত দুই ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকবে। এরপর দুই হাত মাথার পেছন দিকে নিয়ে কনুই ভাঁজ করে আঙুলগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়ো করতে হবে।

 

পরবর্তীতে গভীর শ্বাস নিতে নিতে হাত দুটি মাথার ওপর দিয়ে সোজা আকাশের দিকে প্রসারিত করতে হবে এবং একই সঙ্গে পায়ের গোড়ালি মাটি থেকে ওপরের দিকে তুলতে হবে। শরীরের পুরো ভর তখন কেবল পায়ের আঙুলের ওপর থাকবে।

 

এভাবে মাথা ওপরের দিকে তুলে কুড়ি থেকে ত্রিশ সেকেন্ড অবস্থান করতে হয়, যা উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত সমাদৃত শরীরচর্চা। শিশুদের জন্য আরও একটি অত্যন্ত উপকারী পেশি প্রসারণের শরীরচর্চা হলো প্রজাপতি আসন।

 

 

এটি করার জন্য প্রথমে সমতল মেঝেতে বসে দুই পায়ের পাতা সামনাসামনি একে অপরের সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে রাখতে হবে। এরপর দুই হাত দিয়ে দুই পায়ের পাতা শক্তভাবে ধরে হাঁটু দুটি ওপর-নিচ করতে হবে। দশবারের একটি সেট হিসেবে মোট তিনবার এই ব্যায়ামটি অনুশীলন করতে হবে।

 

নিয়মিত এই আসনটি অভ্যাসের ফলে শিশুর পায়ের পেশির শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, শরীরের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মাংসপেশিতে যে বৃদ্ধিজনিত ব্যথা তৈরি হয়, তা থেকে শিশু অনায়াসেই মুক্তি লাভ করে।

 

এর পাশাপাশি শশঙ্গাসন নামের যোগব্যায়ামটিও অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এই ব্যায়ামের শুরুতে শতরঞ্জির ওপর হাঁটু গেড়ে বসে মেরুদণ্ড একেবারে সোজা রাখতে হয়। দুই হাত হাঁটুর ওপর এমনভাবে রাখতে হবে যেন পায়ের পাতা সম্পূর্ণ আরামদায়ক অবস্থায় থাকে।

 

এরপর ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে নিতে দুই হাত কানের পাশ দিয়ে যতটা সম্ভব ওপরের দিকে তুলতে হবে। পর্যায়ক্রমে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে হাঁটুর সামনে মাথা ঠেকাতে হবে এবং দুই হাত সামনের দিকে প্রসারিত করে রাখতে হবে।

 

পরবর্তীতে হাত দুটি গোড়ালির পাশে নিয়ে প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড এই অবস্থানে থাকার পর পুনরায় ধীরে ধীরে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে হবে। নিয়মিত এসব স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে একটি শিশু তার সর্বোচ্চ শারীরিক বিকাশ অর্জনে সক্ষম হতে পারে।