আপাতদৃষ্টিতে এটি কর্মীদের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক এবং সুবিধাজনক মনে হলেও, এর কিছু নেতিবাচক দিকও ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের স্বনামধন্য তুরকু বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের পরিচালিত একটি নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি তথ্য।
গবেষকরা দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করে বলছেন, বাড়ি থেকে কাজ করার ফলে কর্মীরা আগের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি ঘুমানোর সুযোগ পেলেও, তাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক শারীরিক নড়াচড়া বা হাঁটাচলা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে।
কর্মস্থলে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কাজ করার দিনগুলোর সঙ্গে বাড়িতে বসে কাজ করার দিনগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলনা করে এই সময়োপযোগী গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। মূলত আধুনিক যুগের কর্মীদের দৈনন্দিন চলাফেরা, অলস বা নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন এবং তাদের ঘুমের সময়ের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিহ্নিত করাই ছিল এই গবেষণার প্রধান লক্ষ্য।
গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল এবং পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কর্মস্থলে সশরীরে গিয়ে কাজ করার তুলনায় বাড়িতে বসে কাজ করার দিনগুলোতে কর্মীরা গড়ে পনেরো মিনিট বেশি ঘুমানোর সুযোগ পেয়ে থাকেন। গবেষকদের মতে, এই অতিরিক্ত ঘুমের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাতায়াতের সময়ের সম্পূর্ণ অভাব।
সাধারণত প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়ার সময় কর্মীদের বেশ খানিকটা পথ হাঁটাচলা করতে হয়, সিঁড়ি ভাঙতে হয় কিংবা অনেককে সাইকেল চালানোর মতো শারীরিক কসরত করতে হয়। বাস বা অন্যান্য যানবাহনে ওঠার জন্যও শারীরিক নড়াচড়ার প্রয়োজন হয়।
কিন্তু বাড়িতে বসে কাজের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন সময়সূচি থেকে যাতায়াতের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশটি পুরোপুরি বাদ পড়ে যায়। ফলে সকালে বা রাতে কর্মীদের ঘুমের সময় কিছুটা বাড়লেও, একই সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে এই পনেরো মিনিটের অতিরিক্ত ঘুমকে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও, দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
গবেষণার পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে যে, বাড়িতে বসে কাজের দিনগুলোতে কর্মীরা স্বাভাবিকের তুলনায় গড়ে পঁয়তাল্লিশ মিনিট বেশি সময় কেবল এক জায়গায় বসে অথবা বিছানায় শুয়েই কাটিয়ে দেন।
এই চরম মাত্রার নিষ্ক্রিয় আচরণের পেছনের কারণগুলো বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করতে গিয়ে গবেষকরা দেখতে পান যে, বাড়িতে বসে দাপ্তরিক কাজ করার সময় কর্মীরা দাঁড়িয়ে কাজ করার বা নড়াচড়া করার সুযোগ খুবই কম পান।
আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক কার্যালয়গুলোতে অনেক সময় দাঁড়িয়ে কাজ করার জন্য বিশেষায়িত এবং সুবিধাজনক কাজের জায়গা থাকে, যা কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের নিজস্ব বাড়িতে সেই ধরনের উন্নত কর্মপরিবেশ বা ব্যবস্থা থাকে না।
ফলে বাড়িতে সাধারণ বসার জায়গা বা বিছানায় বসে কাজ করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এর ফলে বাড়িতে বসে কাজের দিনগুলোতে একটানা দাঁড়িয়ে থাকা, কাজের ফাঁকে হালকা নড়াচড়া করা কিংবা মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার যেকোনো শারীরিক কার্যকলাপ প্রায় পুরোপুরি কমে যায়।
গবেষকরা তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদনে আরও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় যেটুকু হাঁটাচলা বা সাইকেল চালানোর মতো একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস নিজে থেকেই তৈরি হয়, বাড়িতে বসে কাজের দিনগুলোতে তার পরিবর্তে সেই পুরো সময়টা মানুষ অলসভাবে বসে, শুয়ে বা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়।
কর্মস্থলে যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই না থাকাই মূলত মানবদেহের এই বিশাল পরিবর্তনের প্রধান কারণ। সহজ কথায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাড়ি থেকে কাজ করার ফলে কর্মীদের যাতায়াতের সময় ও শারীরিক শ্রম যেমন নিশ্চিতভাবে বেঁচে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি যাতায়াতকেন্দ্রিক যে স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত শারীরিক ব্যায়ামটুকু প্রতিদিন হতো, সেটাও আর একেবারেই হচ্ছে না।
এটি ধীরে ধীরে মানুষকে অলসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কর্মীদের এই শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা দূর করে সুস্থতা বজায় রাখার জন্য গবেষকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পরামর্শ প্রদান করেছেন। তারা জোরালোভাবে বলছেন, বাড়ি থেকে কাজ করার সময় একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে বা বসে না থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর ছোট ছোট বিরতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে বসার ভঙ্গি পরিবর্তন করা, প্রতি আধঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পরপর নিজ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো বা কয়েক কদম হাঁটাচলা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে অবসর সময়ে আরও বেশি করে শারীরিক কসরত, যোগব্যায়াম বা অন্যান্য খেলাধুলার মতো কার্যকলাপে যুক্ত হওয়ার ওপরও তারা বিশেষ জোর দিয়েছেন।
এই বৈজ্ঞানিক গবেষণাটি কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল, তার একটি স্পষ্ট রূপরেখাও প্রকাশ করা হয়েছে। কাজের দিনভিত্তিক এই সুনির্দিষ্ট গবেষণায় মোট নিরানব্বই জন পেশাদার কর্মী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
নির্ভুল ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্য সংগ্রহের জন্য অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক কর্মীর শরীরে একটি বিশেষ ধরনের গতি ও নড়াচড়া পরিমাপক যন্ত্র পরানো হয়েছিল। এই অত্যাধুনিক যন্ত্রটির মাধ্যমে কর্মস্থলে এবং বাড়িতে কাজের দিনগুলোতে তাদের সর্বমোট ঘুমের পরিমাণ, অলসভাবে কাটানো সময় এবং সকল ধরনের শারীরিক কার্যকলাপ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা হয়।
উল্লেখ্য, জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও স্বনামধন্য স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকীতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের নজর কেড়েছে।