মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রচুর আয়রনযুক্ত খাবার গ্রহণের পরও শরীরে কেন ঘাটতি থেকে যায়?

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

প্রচুর আয়রনযুক্ত খাবার গ্রহণের পরও শরীরে কেন ঘাটতি থেকে যায়?
ছবি: সংগৃহীত

মানবদেহে সুস্থতা বজায় রাখতে আয়রনের সঠিক মাত্রা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই মনে করেন, কেবল প্রচুর পরিমাণে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেলেই এই ঘাটতি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব।

 

তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। খাবার থেকে শরীর কতটুকু আয়রন গ্রহণ করছে, তা শারীরবৃত্তীয় কাজে কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে তা পর্যাপ্ত পরিমাণে ধরে রাখা যাচ্ছে কি না-তার ওপর নির্ভর করে আয়রনের প্রকৃত মাত্রা।

 

মানবদেহ যে হারে নতুন আয়রন তৈরি করে, তার চেয়ে দ্রুতগতিতে তা বেরিয়ে গেলে অথবা অন্ত্র যদি তা শোষণে ব্যর্থ হয়, তবে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরও ঘাটতি থেকেই যায়। মূলত রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য আয়রন অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

 

হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার একটি বিশেষ প্রোটিন, যা ফুসফুস থেকে সারা শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ করে। আমেরিকান সোসাইটি অব হেমাটোলজির তথ্যমতে, শরীরে সঞ্চিত আয়রনের পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমে গেলে আয়রনের অভাবজনিত রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দেয়।

 

এর ফলে রোগীর মধ্যে চরম ক্লান্তি, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা এবং বুক ধড়ফড় করার মতো নানাবিধ উদ্বেগজনক উপসর্গ প্রকাশ পায়। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচুর পরিমাণে আয়রন-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার অর্থ এই নয় যে তার সম্পূর্ণ অংশই সরাসরি আপনার রক্তে মিশে যাবে।

 

আয়রনের উৎস এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। মূলত মাংস এবং মাছে যে ‘হিম আয়রন’ পাওয়া যায়, তা মানবদেহ খুব সহজেই এবং দ্রুততার সঙ্গে শোষণ করতে পারে। অন্যদিকে শিম, মসুর ডাল, বাদাম, বীজ এবং শাকসবজির মতো উদ্ভিদজাত খাবার থেকে পাওয়া যায় ‘নন-হিম আয়রন’, যা শরীর তুলনামূলকভাবে সহজে গ্রহণ করতে পারে না।

 

তাছাড়া আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের কিছু সাধারণ খাবার ও পানীয় আয়রন শোষণের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রবল বাধা সৃষ্টি করে। যেমন চা এবং কফিতে এমন কিছু রাসায়নিক যৌগ থাকে, যা আয়রন গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। একইসঙ্গে আয়রন-সমৃদ্ধ খাবারের পরপরই বেশি পরিমাণে দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ করলেও শোষণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।

 

তবে যারা মূলত উদ্ভিদজাত খাবার খান, তারা যদি এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার যেমন-লেবুজাতীয় ফল, টমেটো বা তাজা শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখেন, তবে মানবদেহ অনেক সহজে এই নন-হিম আয়রন শোষণ করতে সক্ষম হয়।

 

শরীরে আয়রন ঘাটতির অন্যতম প্রধান একটি কারণ হলো অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক রক্তক্ষরণ। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ‘বিএমজে জার্নালস’-এ প্রকাশিত এক বিশদ গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব নারীর নিয়মিত মাসিক হয়, তাদের খাদ্যতালিকায় প্রচুর আয়রন থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ঋতুস্রাবের কারণে শরীরে সঞ্চিত আয়রন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।

 

মাসিক যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দিন স্থায়ী হয় বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়, তবে তা অতিরিক্ত রক্তপাত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। নারীদেহের পাশাপাশি পাচনতন্ত্র থেকে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণেও যেকোনো মানুষের আয়রনের ভয়াবহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

 

পাকস্থলীর আলসার, পরিপাকতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ, পাইলস এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যথানাশক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এমন অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তপাত হতে পারে। বিশেষ করে পুরুষ বা মেনোপজ পার হওয়া নারীদের ক্ষেত্রে যদি কোনো কারণ ছাড়াই আয়রনের ঘাটতি দেখা যায়, তবে শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

অনেক সময় অন্ত্রের জটিলতার কারণেও শরীর সাধারণ খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। সিলিয়াক ডিজিজ বা এক ধরনের ইমিউনোলজিক্যাল অন্ত্রের রোগ এর একটি বড় উদাহরণ। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইমিউনোলজি’ জার্নালের গবেষণায় দেখা গেছে, সিলিয়াক রোগ ক্ষুদ্রান্ত্রের ভেতরের নরম আস্তরণকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

 

এর ফলে অন্ত্রের পুষ্টি শোষণের স্বাভাবিক ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায় এবং তা সরাসরি আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতার দিকে মোড় নেয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় হজমের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও নীরবে এই রোগ শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।

 

তাই অজানা কারণে রক্তশূন্যতা দেখা দিলে চিকিৎসকরা প্রায়শই সিলিয়াক ডিজিজ বা অন্ত্রের অন্যান্য জটিল রোগের পরীক্ষা করার জোরালো পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কখনো কখনো পাকস্থলীর কোনো বড় অস্ত্রোপচারের পরও পুষ্টি শোষণের এই প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

 

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময় সমস্যাটি পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং শরীরের অতিরিক্ত চাহিদাই প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গর্ভাবস্থায় মাতৃদেহে আয়রনের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়, কারণ এ সময় গর্ভস্থ শিশুর সঠিক বিকাশ ও মায়ের শরীরে অতিরিক্ত রক্ত প্রবাহ নিশ্চিত করতে হয়।

 

একইভাবে দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধির কারণে শিশু ও বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীদেরও অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি মাত্রায় আয়রন প্রয়োজন হয়। এসব ক্ষেত্রে কেবল সাধারণ পুষ্টিকর খাবার শরীরের এই বাড়তি চাহিদা মেটাতে সক্ষম নাও হতে পারে।

 

তাছাড়া দীর্ঘস্থায়ী কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা যেমন-কিডনি রোগ বা দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ লোহিত রক্তকণিকা তৈরি ও ব্যবহারের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। তাই শরীরে হিমোগ্লোবিন বা আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলে সব সময় শুধু খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করা বিজ্ঞানসম্মত নয়।

 

পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার বা চিকিৎসকের নির্ধারিত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরও যদি রক্তে এর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কম থাকে, তবে অন্তর্নিহিত শারীরিক জটিলতাগুলো অনুসন্ধান করে দ্রুত যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা অপরিহার্য।