বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬
১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওষুধ ছাড়াই ফ্যাটি লিভার নিরাময় কি সম্ভব?

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম

ওষুধ ছাড়াই ফ্যাটি লিভার নিরাময় কি সম্ভব?
ছবি : Collected

আধুনিক যুগে অন্যতম নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ফ্যাটি লিভার। অনেকেই মনে করেন, কেবল অতিরিক্ত ওজন থাকলেই এই সমস্যা দেখা দেয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, যেকোনো শারীরিক গঠনের মানুষই এতে আক্রান্ত হতে পারেন।

 

আশার কথা হলো, রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে কোনো ওষুধের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে কেবল দৈনন্দিন জীবনযাপনের ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমেই এটি থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে এই বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বর্তমানে ‘মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’ বা বিপাকীয় অকার্যকারিতা-সংশ্লিষ্ট যকৃতের রোগ বলা হয়। যকৃৎ বা লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে এই জটিলতার সৃষ্টি হয়, যা শরীরে ইনসুলিন কাজ করার ক্ষমতা বা কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।

 

পাশাপাশি এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ এবং পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তবে এর থেকে সুস্থ হতে খুব দ্রুত ওজন কমানোর কোনো অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা না খেয়ে থাকার অভ্যাস অনুসরণ করা মোটেও উচিত নয়।

 

চিকিৎসকদের মতে, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রমে একটি টেকসই পরিবর্তন আনাই হলো সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ওষুধ ছাড়া কি সত্যিই ফ্যাটি লিভার সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব? চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত ইতিবাচকভাবেই এর উত্তর দিয়েছেন।

 

বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি ধরা পড়লে জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনলেই লিভারে জমে থাকা চর্বি ও প্রদাহ কমানো যায়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের অন্তত তিন থেকে পাঁচ শতাংশ কমাতে পারলেই লিভারের চর্বি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।

 

অন্যদিকে, যারা স্থূলতার সমস্যায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে লিভারের টিস্যুর ক্ষতি পূরণে সাত থেকে দশ শতাংশ ওজন কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে শুধু ওজন কমানোই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়, নিয়মিত শারীরিক কসরতও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

যাদের ওজন অতিরিক্ত, তাদের জন্য অত্যন্ত ধীরগতিতে ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ওজন কমানো সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। এর জন্য কঠোর বা অবৈজ্ঞানিক খাদ্যতালিকা অনুসরণের কোনো প্রয়োজন নেই।

 

দৈনিক খাবারের পরিমাণ পরিমিত রাখা, অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার পরিহার করা এবং কায়িক শ্রমের মাত্রা বাড়িয়ে ক্যালরির ঘাটতি তৈরি করা একটি টেকসই সমাধান হতে পারে। দ্রুত ওজন কমানোর পদ্ধতিগুলো দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায় না।

 

উল্লেখ্য, যারা শারীরিকভাবে শুকনা বা ছিপছিপে গড়নের, তারাও ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হতে পারেন। তাদের ক্ষেত্রে ওজন কমানোর চেষ্টা না করে বরং সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতির দিকে মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

 

সুস্থতার এই যাত্রায় প্রথমেই অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টিজাতীয় পানীয় এবং পরিশোধিত শর্করাজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। এসব খাবার শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমতে সাহায্য করে। কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত ফলের রস, বিস্কুট বা কেকের মতো প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে প্রচুর আঁশ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার বেছে নিতে হবে।

 

তাজা শাকসবজি, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম এবং ফলমূল হতে পারে আদর্শ খাবার। তবে শর্করা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং এর গুণগত মান ও পরিমাণের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখাটাই জরুরি।

 

ফ্যাটি লিভার থাকার অর্থ এই নয় যে খাদ্যতালিকা থেকে সব ধরনের চর্বি একেবারে বাদ দিয়ে দিতে হবে। মূলত স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত চর্বি এবং ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবারের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। এর বদলে পরিমিত মাত্রায় আনস্যাচুরেটেড বা অসম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ করা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

 

বাদাম, বীজ, সামুদ্রিক মাছ এবং উদ্ভিজ্জ তেল এই স্বাস্থ্যকর চর্বির চমৎকার উৎস। ডুবো তেলে ভাজা খাবার এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস খাওয়া যথাসম্ভব সীমিত করতে হবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার পুরোপুরি বর্জন করার চেয়ে বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসকে একটি স্বাস্থ্যকর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

 

খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম ফ্যাটি লিভার ব্যবস্থাপনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওজন মাপার যন্ত্রে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন না এলেও ব্যায়ামের সুফল শরীরের ভেতরে ঠিকই কাজ করে।

 

চিকিৎসা সাময়িকী ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন ফিজিওলজি’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম, যেমন-জোরে হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা বা জগিং করা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করে এবং লিভারের চর্বি গলাতে সাহায্য করে।

 

এছাড়া শক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামগুলো পেশি গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। একটি বাস্তবসম্মত উপায় হলো, দৈনন্দিন হাঁটাচলার পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ানো এবং এমন শারীরিক কার্যকলাপ বেছে নেওয়া যা প্রতিদিন আনন্দ নিয়ে করা যায়।

 

সবশেষে, ফ্যাটি লিভার মানুষের সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রক্তে শর্করার উচ্চমাত্রা, ইনসুলিনের অকার্যকারিতা, ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এবং উচ্চ রক্তচাপ লিভারের রোগকে আরও জটিল করে তোলে।

 

তাই শুধু খাদ্যাভ্যাস বা ব্যায়ামের ওপর নির্ভর না করে রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। অনেক সময় এসব শারীরিক সমস্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হতে পারে।

 

এর অর্থ এই নয় যে জীবনযাত্রায় আনা পরিবর্তনগুলো ব্যর্থ হয়েছে। বরং আধুনিক চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন-এই দুটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করলেই ফ্যাটি লিভারের মতো নীরব ঘাতককে চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব হয়।