বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাতভর মুঠোফোন চার্জে রাখলে কি ব্যাটারির ক্ষতি হয়?

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১৫ পিএম

রাতভর মুঠোফোন চার্জে রাখলে কি ব্যাটারির ক্ষতি হয়?
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান আধুনিক ও দ্রুতগতির জীবনযাত্রায় মুঠোফোন বা স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মুঠোফোনটি বিদ্যুতের সংযোগে বা চার্জে বসিয়ে রাখা এবং পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তা খুলে নেওয়া-আমাদের প্রায় সকলেরই একটি অত্যন্ত সাধারণ ও নিয়মিত অভ্যাস।

 

কিন্তু প্রযুক্তিপ্রেমী ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের মনে প্রায়শই একটি গভীর প্রশ্ন ও উদ্বেগ কাজ করে যে, মুঠোফোনের ব্যাটারি সম্পূর্ণ বা শতভাগ পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও যদি সেটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুতের সংযোগে যুক্ত থাকে, তবে কি ব্যাটারির কোনো মারাত্মক ক্ষতি হয়?

 

অতীতের প্রযুক্তিগত ধারণার ওপর ভিত্তি করে অনেকেই মনে করেন যে এতে মুঠোফোন চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তবে আধুনিক স্মার্টফোনের উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন এবং বেশ স্বস্তিদায়ক।

 

বর্তমান সময়ের আধুনিক স্মার্টফোনগুলোতে সাধারণত অত্যন্ত উন্নত মানের লিথিয়াম-আয়ন অথবা লিথিয়াম-পলিমার ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই আধুনিক প্রযুক্তি কাঠামোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা বা স্বয়ংক্রিয় শক্তি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

 

যখন একটি মুঠোফোন সম্পূর্ণ রূপে চার্জ হয়ে যায়, তখন এর অভ্যন্তরীণ সার্কিট বা ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুতের সরবরাহ কমিয়ে দেয় অথবা মূল চার্জিং প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। এর ফলে শতভাগ চার্জে পৌঁছানোর পর ব্যাটারির ভেতরে নতুন করে আর কোনো বিদ্যুৎ প্রবেশ করতে পারে না।

 

সুতরাং, সারা রাত বিদ্যুতের সংযোগে যুক্ত রাখলেই যে মুঠোফোনটি অতিরিক্ত চার্জ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরিত হবে বা একেবারেই নষ্ট হয়ে যাবে, এমন প্রচলিত ধারণাটি বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে একেবারেই সঠিক নয়।

 

তবে তাৎক্ষণিক কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা ক্ষতি না হলেও, দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাটারিকে শতভাগ পূর্ণ অবস্থায় রাখাটা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনোভাবেই আদর্শ বা স্বাস্থ্যকর বলে বিবেচিত হয় না।

 

লিথিয়াম-ভিত্তিক ব্যাটারিগুলোর রাসায়নিক গঠন এমনভাবে তৈরি যে, এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের পূর্ণ ধারণক্ষমতায় থাকলে এর ভেতরের রাসায়নিক উপাদানগুলোতে এক ধরনের অদৃশ্য কাঠামোগত চাপ তৈরি হয়।

 

এই ক্রমাগত চাপের ফলে ব্যাটারির রাসায়নিক অবক্ষয়ের হার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর প্রত্যক্ষ ও নেতিবাচক প্রভাবটি গিয়ে পড়ে ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদি আয়ু বা সর্বোচ্চ শক্তি ধারণক্ষমতার ওপর।

 

যার ফলে কয়েক মাস বা বছরখানেক একটানা ব্যবহারের পর ব্যবহারকারীরা লক্ষ্য করেন যে, আগের তুলনায় মুঠোফোনের চার্জ খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, সারা রাত চার্জে লাগিয়ে রাখার কারণে মুঠোফোনের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হয়, তা কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারির স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দ্রুত কমে যাওয়া।

 

ব্যাটারির স্থায়িত্ব ও সুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। চার্জ দেওয়ার সময় মুঠোফোন প্রাকৃতিকভাবেই কিছুটা গরম হয়, যা একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।

 

কিন্তু এই তাপ যদি অতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যায়, তবে তা ব্যাটারির অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক কাঠামোর ওপর মারাত্মক ও বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আমাদের মধ্যে অনেকেই নিজের অজান্তে রাতে ঘুমানোর সময় মুঠোফোনটিকে বালিশের নিচে, বিছানার নরম তোশকের ওপর অথবা কম্বলের ভাঁজে লুকিয়ে রেখে চার্জে যুক্ত করে থাকি।

 

এটি অত্যন্ত মারাত্মক একটি ভুল অভ্যাস। এ ধরনের নরম ও আবদ্ধ স্থানগুলোতে মুঠোফোনের চারপাশের স্বাভাবিক বাতাস চলাচলের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে চার্জিং প্রক্রিয়ার সময় উৎপন্ন হওয়া তাপ কোনোভাবেই বাইরে বের হতে পারে না এবং মুঠোফোনটি মারাত্মকভাবে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

 

তাই ব্যাটারিকে সুরক্ষিত রাখতে চার্জ দেওয়ার সময় মুঠোফোনটিকে সবসময় শক্ত, সমতল এবং খোলামেলা জায়গায় রাখা একটি নিরাপদ ও অত্যাবশ্যকীয় অভ্যাস। ব্যবহারকারীদের এই ধরনের অসচেতনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির হাত থেকে মুঠোফোনকে রক্ষা করতে বর্তমান সময়ের প্রায় প্রতিটি আধুনিক মুঠোফোনেই বিশেষ স্বয়ংক্রিয় ব্যাটারি সুরক্ষা সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।

 

বিভিন্ন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এটিকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করলেও এর মূল কাজ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন চার্জ দেওয়ার অভ্যাস বিশ্লেষণ করা। এই অত্যাধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুঝতে পারে ব্যবহারকারী কখন ঘুম থেকে ওঠেন।

 

তাই রাতে চার্জে বসানো মাত্রই এরা মুঠোফোনটিকে শতভাগ পূর্ণ না করে, আশি শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করে আটকে রাখে এবং ব্যবহারকারীর ঘুম থেকে ওঠার ঠিক কিছুক্ষণ আগে বাকি চার্জটুকু সম্পন্ন করে। এর ফলে ব্যাটারি দীর্ঘ সময় ধরে শতভাগ পূর্ণ অবস্থায় থাকার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সহজেই রক্ষা পায়।

 

এছাড়া মানসম্মত ও আসল চার্জার এবং কেবল ব্যবহার করাও ব্যাটারির আয়ু বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। পরিশেষে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, আধুনিক প্রযুক্তির মুঠোফোনগুলোতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ নিয়ন্ত্রণের একাধিক অত্যন্ত উন্নত ও নিরাপদ সুরক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায়, সারা রাত চার্জে লাগিয়ে রাখলেই মুঠোফোনটি সঙ্গে সঙ্গে অকেজো হয়ে যাবে-এমনটা ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

 

তবে ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং এর সর্বোচ্চ সেবা পেতে কিছু সতর্কতা অবশ্যই মেনে চলা উচিত। মুঠোফোন অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকে রক্ষা করা, মানসম্মত চার্জার ব্যবহার করা এবং মুঠোফোনের অভ্যন্তরীণ ব্যাটারি সুরক্ষা ব্যবস্থাটি সবসময় চালু রাখা একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ।

 

আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, স্মার্টফোনের ব্যাটারি একটি স্বাভাবিক ক্ষয়যোগ্য রাসায়নিক উপাদান। আপনি যতই সচেতনভাবে এর যত্ন নিন না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবেই এর নিজস্ব সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে।

 

শুধুমাত্র রাতভর চার্জে রাখার কারণেই যে একটি মুঠোফোনের ব্যাটারি নষ্ট হয়-এই প্রচলিত ধারণাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বরং পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা, প্রতিদিনের ব্যবহারের ধরন, চার্জ দেওয়ার অভ্যাস এবং ব্যাটারির সামগ্রিক বয়স-এই সবকিছুর একটি নিবিড় ও সম্মিলিত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই মূলত একটি মুঠোফোনের ব্যাটারির প্রকৃত স্থায়িত্ব বা আয়ুষ্কাল নির্ধারিত হয়ে থাকে।