শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়াতে ও প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষায় যে দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম

গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়াতে ও প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষায় যে দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি
ছবি: সংগৃহীত

মাতৃত্ব যেকোনো নারীর জীবনের অন্যতম একটি সংবেদনশীল ও আকাঙ্ক্ষিত অধ্যায়। যারা মা হতে চাইছেন, তাদের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়।

 

সাধারণত সম্ভাব্য ডিম্বস্ফোটন বা ঋতুস্রাবের নির্দিষ্ট তারিখ মনে রাখা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং জীবনযাপনের সাধারণ নিয়মকানুনগুলোর ওপর অনেকেই জোর দিয়ে থাকেন। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, প্রজনন ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে এমন বেশ কিছু সূক্ষ্ম বিষয় প্রায়শই আমাদের নজরের বাইরে থেকে যায়।

 

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এমন কিছু সাধারণ অভ্যাস রয়েছে, যা অজান্তেই গর্ভধারণ প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলতে পারে অথবা গর্ভবতী হওয়ার স্বাভাবিক সম্ভাবনাকে অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কেবল একদিনের অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, এক রাতের অনিদ্রা বা সামান্য মানসিক চাপই গর্ভধারণে স্থায়ী বাধা সৃষ্টি করবে।

 

মূলত প্রজনন ক্ষমতা মানুষের বয়স, ডিম্বস্ফোটনের সময়কাল, শুক্রাণুর স্বাস্থ্য, শারীরিক সুস্থতা এবং সামগ্রিক প্রজননতন্ত্রের অবস্থার মতো বহুমুখী কারণের ওপর নির্ভর করে। তাই জীবনযাপনে কিছু ইতিবাচক ও ধারাবাহিক পরিবর্তন আনা গেলে তা প্রজনন সক্ষমতা বাড়াতে এবং সুস্থ গর্ভধারণের সম্ভাবনাকে বহুগুণ উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

 

গর্ভধারণের চেষ্টার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সাধারণ ভুল ধারণা হলো, ডিম্বস্ফোটনের নির্দিষ্ট একটি দিনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রজননের উপযুক্ত সময়কাল আসলে কেবল এক দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি বেশ কয়েক দিন জুড়ে বিস্তৃত থাকে।

 

নারীদেহের প্রজননতন্ত্রে শুক্রাণু বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত জীবিত ও কার্যকর থাকতে পারে। অন্যদিকে, ডিম্বস্ফোটনের পর ডিম্বাণু নিষিক্তকরণের জন্য সময় তুলনামূলকভাবে অনেক কম থাকে। এই জৈবিক সমীকরণের কারণে, প্রজনন চক্রের একটি বিস্তৃত সময়জুড়ে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখলে ডিম্বস্ফোটনের সময় শুক্রাণু উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়, যা গর্ভধারণকে সহজ করে।

 

বিশেষ করে যাদের মাসিক চক্র অনিয়মিত, তাদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দিনপঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডারের হিসাব করে ডিম্বস্ফোটনের সঠিক সময় অনুমান করা বেশ কঠিন হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শারীরিক বিভিন্ন লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করা বেশি কার্যকর হতে পারে।

 

প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তামাক গ্রহণ বা ধূমপানের অভ্যাসকে। ধূমপান কেবল নারীর নয়, পুরুষের প্রজনন ক্ষমতার ওপরও অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, নারীদের ক্ষেত্রে তামাকের ক্ষতিকর উপাদান সরাসরি ডিম্বাশয় এবং প্রজননতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে।

 

অন্যদিকে, পুরুষদের ক্ষেত্রে ধূমপানের কারণে শুক্রাণুর গুণগত মান এবং কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। আন্তর্জাতিক প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি গবেষণাপত্রের তথ্য অনুযায়ী, গর্ভধারণের চেষ্টা করার সময় নিজে ধূমপান করার পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান বা সিগারেটের ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশও সযত্নে এড়িয়ে চলা উচিত।

 

চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন যে, প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে এবং অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ধূমপানের অভ্যাস সম্পূর্ণ ত্যাগ করা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। যেহেতু গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সুস্থ শুক্রাণুর ভূমিকা অপরিহার্য, তাই সঙ্গীরও এই ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জন করা অত্যন্ত জরুরি।

 

ধূমপানের পাশাপাশি নিয়মিত বা অতিরিক্ত মদ্যপানের অভ্যাসও প্রজনন ক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। গর্ভধারণের প্রস্তুতি গ্রহণের পর থেকে এই বিষয়ে সচেতনতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, মদ জাতীয় পানীয় ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশ এবং মাতৃগর্ভে শিশুর সার্বিক গঠনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

 

চিকিৎসকরা সর্বদাই পরামর্শ দেন যে, কেউ যদি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে মদ্যপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা একটি অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। এটি গর্ভপাতের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি একটি সুস্থ ও সুন্দর গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

 

গর্ভধারণের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ঘুমের বিষয়টিকে অধিকাংশ মানুষই তেমন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন না। অথচ নারী স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, ঘুমের চরম ব্যাঘাত বা অপর্যাপ্ত ঘুম নারীদের বন্ধ্যত্বের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক ও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

 

ক্রমাগত রাত জাগা বা খুব কম সময় ঘুমানোর অভ্যাস মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য, মেজাজ এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যকলাপের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। গর্ভধারণের নিশ্চয়তা দেয় এমন কোনো নির্দিষ্ট ঘণ্টার হিসাব চিকিৎসাবিজ্ঞানে না থাকলেও, একটি নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর ঘুমের রুটিন বজায় রাখা শরীরের হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় দারুণভাবে সাহায্য করে।

 

বিশেষ করে যাদের রাত জাগার দীর্ঘদিনের অভ্যাস রয়েছে, তাদের ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার সময়ের মধ্যে একটি নিয়মতান্ত্রিক সামঞ্জস্য আনা প্রয়োজন। সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য শরীরকে প্রস্তুত করতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

আধুনিক নাগরিক জীবনে বন্ধ্যত্ব বা গর্ভধারণে বিলম্বের জন্য অনেক সময় মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়। মানসিক চাপের সাথে প্রজনন স্বাস্থ্যের সম্পর্কটি বেশ জটিল ও গভীর। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ একজন মানুষের স্বাভাবিক ঘুম, খাদ্যাভ্যাস, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং যৌন আকাঙ্ক্ষার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে কিছু নারীর শরীরে ডিম্বস্ফোটনের সঙ্গে জড়িত হরমোনগুলোর স্বাভাবিক নিঃসরণে বাধা সৃষ্টি হয়। তবে মানসিক চাপ কমানোর কথা ভেবে উল্টো আরও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া কোনো সমাধান নয়।

 

এর পরিবর্তে নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্য আত্মযত্নের সহজ উপায়গুলোর ওপর মনোযোগ দেওয়া উচিত। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করা, প্রতিদিন পর্যাপ্ত সময় ঘুমানো, প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো অথবা নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত কোনো আপনজনের সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নেওয়া মানসিক চাপ মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।