মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অতিরিক্ত পানি পান করলেই কি ওজন কমে?

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

অতিরিক্ত পানি পান করলেই কি ওজন কমে?
ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক জীবনযাপনে ওজন কমানোর নানা কৌশল নিয়ে মানুষের আগ্রহের কোনো কমতি নেই। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ মাত্রই বিভিন্ন ধরনের ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত এবং জনপ্রিয় একটি ধারণা হলো-বেশি করে পানি পান করলে দ্রুত ওজন কমানো সম্ভব।

 

শরীরচর্চা কেন্দ্র থেকে শুরু করে পুষ্টিবিদদের চেম্বার, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্বাস্থ্যবিষয়ক পাতাগুলোতেও নিয়মিত এই পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। বলা হয়, প্রতিবার ভারী খাবার গ্রহণের আগে এক গ্লাস পানি পান করা কিংবা ক্যালরিযুক্ত কোমল পানীয় পরিহার করে সাধারণ পানি পানের অভ্যাস ওজন নিয়ন্ত্রণে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে।

 

কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদ্যার গবেষণায় এই দাবির সত্যতা ঠিক কতটা? অতিরিক্ত পানি পান করা কি সত্যিই মেদ ঝরাতে সরাসরি সাহায্য করে, নাকি এটি নিছকই একটি বহুল প্রচলিত মুখরোচক ধারণা?

 

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষকরা বিষয়টিকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের মতে, পানি সরাসরি শরীরের চর্বি পোড়াতে সক্ষম নয়, তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে দারুণভাবে পরোক্ষ সহায়তা করে থাকে।

 

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে পানি পানের সবচেয়ে বড় এবং বৈজ্ঞানিক সুবিধা হলো এতে কোনো ক্যালরি বা খাদ্যশক্তি নেই। বর্তমান বিশ্বে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো চিনিযুক্ত পানীয় বা প্রক্রিয়াজাত জুস গ্রহণের প্রবণতা।

 

একজন মানুষ যখন তৃষ্ণা মেটাতে উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত কোমল পানীয়ের পরিবর্তে সাধারণ ও বিশুদ্ধ পানি পান করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার দৈনন্দিন ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অনেকটা কমে যায়।

 

এর জন্য তাকে আলাদা করে নিজের মূল খাদ্যতালিকায় খুব বড় কোনো পরিবর্তন আনতে হয় না। ধারণাটি শারীরবৃত্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বেশ সহজবোধ্য। পাকস্থলীতে যখন পানি প্রবেশ করে, তখন তা ভেতরের কিছুটা জায়গা দখল করে নেয়।

 

এর ফলে মস্তিষ্কে একটি সংকেত পৌঁছায় যে পেট ভরা আছে, যা মূলত খাওয়ার সময় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতাকে কমিয়ে দেয়। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই প্রভাব সব মানুষের ক্ষেত্রে সমানভাবে কাজ করে না।

 

তাই খাবার খাওয়ার আগে কেবল পানি পান করাকেই সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা কোনোভাবেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। পানি পানের সঙ্গে শরীরের বিপাক ক্রিয়া বা মেটাবলিজম বৃদ্ধির একটি প্রচলিত ধারণাও সমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

 

অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, বরফ শীতল বা অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি পান করলে শরীরকে সেই পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে আসতে অতিরিক্ত ক্যালরি পোড়াতে হয়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে থার্মোজেনেসিস বলা হলেও, বাস্তবে এর প্রভাব অত্যন্ত নগণ্য।

 

স্বাস্থ্য গবেষকরা জানিয়েছেন, ঠান্ডা পানি পানের ফলে শরীরের শক্তি ব্যয় এবং অন্যান্য বিপাকীয় প্রক্রিয়ার ওপর যে প্রভাব পড়ে, তা নিতান্তই স্বল্পমেয়াদী। এর মানে এই নয় যে, সারাদিন ধরে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করলেই জাদুমন্ত্রের মতো শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরে যাবে।

 

শুধুমাত্র পানি পানের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে বিপাক ক্রিয়া নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায় কিংবা শরীর নিজে থেকেই বিশাল পরিমাণ ওজন হ্রাস করে ফেলে-আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

 

বরং অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পানি পানের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হলে তাদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) বা কোমরের পরিধিতে জাদুকরী কোনো পরিবর্তন আসে না। তবে হ্যাঁ, অস্বাস্থ্যকর পানীয়ের বদলে সাধারণ পানির ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে সামান্য হলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

ওজন কমানোর আলোচনায় ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার অনুভূতির মধ্যকার বিভ্রান্তিও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ফিজিওলজি অ্যান্ড বিহেভিয়ার জার্নাল’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষ অনেক সময় নিজের তৃষ্ণার অনুভূতিকে ক্ষুধা হিসেবে ভুল করে বসে।

 

মানব মস্তিষ্কের যে অংশটি ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণ করে, তা অনেক সময় কাছাকাছি ধরনের সংকেত প্রদান করে। ফলে অনেকেই শরীরে কেবল পানির ঘাটতি তৈরি হলেও ভুল করে ভারী খাবার খেয়ে ফেলেন, যা ওজন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

শরীরের স্বাভাবিক কার্যকলাপ, রক্ত সঞ্চালন এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সুস্থতার জন্য সর্বদা আর্দ্র বা হাইড্রেটেড থাকা অত্যন্ত জরুরি। তবে তৃষ্ণা এবং ক্ষুধার মধ্যকার এই মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কটি প্রচলিত ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, পানি পানের জন্য প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা মোটেও উচিত নয়।

 

নিয়মিত বিরতিতে পরিমিত তরল গ্রহণ শরীরে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। পানিশূন্যতার কারণে মানুষের মধ্যে অকারণে ক্লান্তি, প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখার অভাবের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

 

কিন্তু তাই বলে যখন আপনার সত্যিই ক্ষুধা পাবে, তখন সেই ক্ষুধা দমনের জন্য জোর করে শুধু পানি পান করা চরম বোকামি। কারণ সেই মুহূর্তে আপনার শরীরের পেশি ও কোষগুলোর বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত খাবার এবং অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন হয়, যা পানি কোনোভাবেই পূরণ করতে পারে না।

 

দৈনন্দিন জীবনে একজন মানুষের ঠিক কতটা পানি পান করা উচিত, তা নিয়েও মানুষের মধ্যে বিস্তর কৌতূহল রয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, পানি পানের এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ও সর্বজনীন পরিমাণ নেই যা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য একইভাবে উপযুক্ত হবে।

 

মানুষের শরীরের আকার, দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা, বসবাসের স্থানের আবহাওয়া ও তাপমাত্রা, গর্ভাবস্থা, সন্তানকে স্তন্যপান করানো এবং শারীরিক অসুস্থতার মতো অসংখ্য পরিবর্তনশীল কারণের ওপর ভিত্তি করে তরলের প্রয়োজনীয়তা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে।

 

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর মতো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো বেশিরভাগ পূর্ণবয়স্ক মানুষকে দিনে গড়ে ছয় থেকে আট কাপ বা গ্লাস তরল পান করার একটি সাধারণ পরামর্শ দিয়ে থাকে।

 

তবে তারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এটাও উল্লেখ করেছে যে, অ্যাথলেট বা যারা রোদে বেশি কাজ করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই চাহিদার পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি কম চর্বিযুক্ত দুধ এবং চিনিবিহীন চা বা কফির মতো পানীয়ও দৈনন্দিন তরলের চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারে।

 

এছাড়াও আমরা প্রতিদিন যে ফলমূল বা শাকসবজি খাই, সেখান থেকেও শরীর একটি বড় অংশের পানি গ্রহণ করে থাকে। তাই জোর করে অতিরিক্ত পানি পান করার চেয়ে নিজের তৃষ্ণা এবং প্রস্রাবের রঙকে ব্যবহারিক নির্দেশিকা বা মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন কোনো মানুষের শরীরে পর্যাপ্ত ও সঠিক মাত্রায় পানি থাকে, তখন তার প্রস্রাব সাধারণত অত্যন্ত পরিষ্কার ও হালকা হলুদ রঙের হয়ে থাকে। প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলে বুঝতে হবে শরীরে পানির ঘাটতি রয়েছে।

 

অনেকেই আবার দ্রুত ওজন কমানোর অন্ধ মোহে পড়ে একটি মারাত্মক ভুল করে বসেন, আর তা হলো মাত্রাতিরিক্ত পানি পান করা। বেশি পানি পান করা মানেই যে সবসময় শরীরের জন্য মঙ্গলজনক হবে, বিষয়টি একেবারেই তেমন নয়।

 

বরং অল্প সময়ের ব্যবধানে অতিরিক্ত পরিমাণে পানি পান করা মানুষের জীবনের জন্য চরম বিপজ্জনক বা প্রাণঘাতীও হতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে হাইপোন্যাট্রেমিয়া বা ওয়াটার ইনটক্সিকেশন বলা হয়।

 

অতিরিক্ত পানি পানের ফলে শরীরের রক্তে সোডিয়াম বা লবণের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষে পানি জমে ফুলে যেতে পারে, যা অত্যন্ত গুরুতর এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

তাই শুধুমাত্র ওজন কমানোর প্রতিযোগিতায় নেমে জোর করে প্রতিদিন কয়েক লিটার পানি পান করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। একজন সুস্থ ও সচেতন মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরকে সতেজ রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা, কোনোভাবেই অতিরিক্ত পানি পান করা নয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং পরিমিত পানি পানের সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমেই কেবল একটি সুস্থ শরীর ও কাঙ্ক্ষিত ওজন লাভ করা সম্ভব।