মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মন খুলে কান্নার পর কেন অদ্ভুত স্বস্তি মেলে, চোখের জলের মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

মন খুলে কান্নার পর কেন অদ্ভুত স্বস্তি মেলে, চোখের জলের মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
ছবি: সংগৃহীত

মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য ও স্বাভাবিক আবেগীয় বহিঃপ্রকাশ হলো কান্না। দৈনন্দিন জীবনের কঠিন কোনো মুহূর্ত, মানসিক চাপ কিংবা হতাশার দিন পার করার পর নির্জনে কিছুক্ষণ মন খুলে কাঁদলে অনেকেই এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করেন।

 

আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য গবেষকরা দীর্ঘকাল ধরে কান্নার এই প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, কান্না হয়তো মূল সমস্যার কোনো বাস্তব সমাধান দিতে পারে না।

 

কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এই অশ্রুপাত কখনও কখনও আমাদের পুঞ্জীভূত আবেগগুলোকে সামলানো ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। কান্না কেবল দুঃখের প্রতীক নয়; প্রচণ্ড আঘাত, বিহ্বলতা, ক্ষোভ বা আনন্দতেও মানুষের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে পারে।

 

কিন্তু ঠিক কোন কারণে কান্নার পর মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীর এতটা হালকা বোধ করে? আধুনিক জীবনযাত্রার চাপে মানুষের মনের ভেতরে প্রতিনিয়ত নানা নেতিবাচক আবেগ জমা হতে থাকে। এই পুঞ্জীভূত আবেগ যখন মানুষ চেপে রাখার চেষ্টা করে, তখন তা মানসিক ও শারীরিকভাবে চরম ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

 

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনুভূতিগুলোকে অবদমন করে রাখার পরিবর্তে, কান্না মানবদেহকে সেই চাপ প্রকাশ করার একটি স্বাভাবিক পথ তৈরি করে দেয়। এর মানে এই নয় যে, চোখের পানি জাদুমন্ত্রের মতো মানসিক চাপকে সম্পূর্ণরূপে দূর করে দিতে সক্ষম।

 

তবে দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপের পর, কোনো নিরাপদ মুহূর্তে নিজেকে অঝোরে কাঁদতে দেওয়াটা এক ধরনের মানসিক মুক্তির স্বাদ এনে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তি আসে ঠিক তখনই, যখন তাকে আর নিজের আসল আবেগ লুকিয়ে রাখতে হয় না বা সমাজের ভয়ে অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের কৃত্রিম অভিনয় করতে হয় না।

 

আবেগঘন মুহূর্তে যখন মানুষ কাঁদতে শুরু করে, তখন তার শরীরের ভেতরে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন সংঘটিত হতে দেখা যায়। কান্নার প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকেই বুকে এক ধরনের তীব্র চাপ অনুভব করেন, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পায়, পেশিতে টান পড়ে এবং হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হয়ে ওঠে।

 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আবেগের এই চরম পর্যায়টি যখন ধীরে ধীরে কেটে যেতে শুরু করে, তখন মানবদেহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি শান্ত ও শিথিল অবস্থার দিকে অগ্রসর হয়। কান্নার ফলে মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র উদ্দীপ্ত হয়, যা মূলত শরীরকে বিশ্রাম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।

 

কান্নার চূড়ান্ত পর্যায়ের পর শ্বাস-প্রশ্বাস পুনরায় ধীর হয়ে আসে, টানটান পেশিগুলো শিথিল হতে শুরু করে এবং অনুভূতির তীব্রতা অনেকটাই সহনশীল স্তরে নেমে আসে। শারীরিক ও স্নায়বিক এই পরিবর্তনের কারণেই কান্নার পর মনে হয় যেন বুক থেকে বিশাল পাথরের ভার নেমে গেছে।

 

অনেক সময় আমরা নিজেরাই ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারি না যে আমাদের অবচেতন মনে আসলে কী চলছে, যতক্ষণ না আমরা অনুভূতিগুলো প্রকাশ করার সুযোগ করে দিই। প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মোটিভেশন অ্যান্ড ইমোশন জার্নাল’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুসারে, কান্না কোনোভাবেই মানুষকে তার মূল আবেগ থেকে দূরে সরিয়ে নেয় না; বরং এটি সেই আবেগকে গভীরভাবে স্বীকার করে নেওয়ার জন্য মস্তিষ্ককে একটি প্রয়োজনীয় বিরতি প্রদান করে।

 

এই বিরতিটি একজন মানুষকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করে যে, সে হয়তো মানসিকভাবে চরম আঘাত পেয়েছে, হতাশ হয়েছে অথবা পরিস্থিতির চাপে পুরোপুরি অভিভূত হয়ে পড়েছে। এই আবেগীয় সচেতনতা পরবর্তীতে একজন মানুষের ঠিক কী প্রয়োজন, সে সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করে।

 

উদাহরণস্বরূপ, কর্মক্ষেত্রের চাপযুক্ত পরিস্থিতি নিয়ে মন খুলে কান্নার পর একজন ব্যক্তি হয়তো সহজেই উপলব্ধি করেন যে, নিজেকে আরও কাজের চাপ দেওয়ার পরিবর্তে তার আসলে কিছুটা বিশ্রাম, প্রিয়জনের সমর্থন অথবা একটি বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা বেশি প্রয়োজন।

 

মানবীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে কান্না একটি শক্তিশালী অবাচনিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ‘রিসার্চগেট’-এ প্রকাশিত সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা অনুসারে, যে ব্যক্তি চরম কষ্টে কাঁদছেন, তিনি হয়তো মুখে শব্দ উচ্চারণ করে ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন না যে তিনি কতটা মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

 

কিন্তু তার গড়িয়ে পড়া চোখের পানি সমাজকে এই ইঙ্গিত দেয় যে তিনি গভীর কষ্টে আছেন এবং তার সাহায্যের প্রয়োজন। এমন স্পর্শকাতর মুহূর্তে যখন কোনো কাছের মানুষ এগিয়ে এসে তাকে সান্ত্বনা দেন অথবা কেবল নিশ্চুপভাবে তার কষ্টের কথাগুলো শোনেন, তখন সেই সামাজিক সমর্থন একজন ক্রন্দনরত ব্যক্তির স্বস্তির অনুভূতিকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

 

ঠিক এ কারণেই, একা একা গুমরে কাঁদার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য মানুষের সামনে কাঁদার অনুভূতি অনেক বেশি নিরাময়মূলক হয়ে থাকে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান এটিও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কান্নার পর সবসময় মন ভালো হয়ে যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কান্না মানসিক অবস্থার সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধারের কোনো নিশ্চিত উপায় নয়।

 

কান্নার পর আপনি হয়তো সাময়িকভাবে কিছুটা শান্ত বোধ করতে পারেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় এর পরপরই মানুষ চরম শারীরিক ক্লান্তি, অস্বস্তি অথবা আগের চেয়েও বেশি আবেগপ্রবণ বোধ করছেন। এই প্রভাবটি মূলত কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

 

আপনি ঠিক কী কারণে কাঁদছেন, আপনি কোথায় অবস্থান করছেন, চারপাশের পরিবেশটি কতটা নিরাপদ এবং কান্নার পর আপনি কাঙ্ক্ষিত মানসিক সমর্থন পাচ্ছেন কি না-এই বিষয়গুলো বিশাল ভূমিকা রাখে।

 

যদি কান্নার পেছনের মূল সমস্যার সমাধান না হয়, তবে কান্নার পর পাওয়া তাৎক্ষণিক স্বস্তি ধীরে ধীরে কমে গেলে পুরোনো বিষাদ আবার ফিরে আসতে পারে। তাই কান্নাকে কোনোভাবেই মানসিক কষ্টের চূড়ান্ত নিরাময় হিসেবে দেখা উচিত নয়।

 

সমাজে এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে না কাঁদার বা আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয় না। পেশাগত বা সামাজিক জীবনে এমন পরিস্থিতি থাকতে পারে যেখানে বাধ্য হয়েই আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হয়।

 

যেমন-অফিসের মিটিং চলাকালে অথবা জরুরি অবস্থায় যখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হয়। তবে মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, ক্রমাগত যদি কোনো মানুষের মধ্যে এই অনুভূতি কাজ করে যে সমাজের ভয়ে প্রতিটি আবেগীয় প্রতিক্রিয়াকে অবদমন করতে হবে, তবে তা অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

 

দীর্ঘমেয়াদে আবেগ চেপে রাখার এই প্রবণতা নিজের মানসিক অবস্থা বুঝতে চরম বাধা সৃষ্টি করে। আবার মন খারাপ হলেই যে নিজেকে জোর করে কাঁদাতে হবে, এরও কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কারণ প্রতিটি মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে নিজের আবেগ প্রকাশ করে থাকেন।

 

কেউ খুব সহজেই কেঁদে ফেলেন, আবার অনেকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হলেও খুব কমই চোখের পানি ফেলেন। সময়ে সময়ে কান্না করাটা স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর। কিন্তু এই কান্না যদি অস্বাভাবিক মাত্রায় ঘন ঘন হতে থাকে অথবা অনিয়ন্ত্রিত রূপ ধারণ করে, তবে তা গভীর উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

 

বিশেষ করে যখন অনিয়ন্ত্রিত কান্নার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী দুঃখবোধ, চরম বিষণ্ণতা, হতাশা, আগ্রহের অভাব, তীব্র উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা অথবা দৈনন্দিন কাজকর্ম সামলাতে অসুবিধা হওয়ার মতো লক্ষণগুলো যুক্ত হয়, তখন সেদিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

 

এমন অবস্থায় একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি কথা বলাটা জরুরি। পেশাদার চিকিৎসা গ্রহণ করলে মানসিক কষ্টের পেছনের প্রকৃত কারণটি শনাক্ত করতে সাহায্য হতে পারে। পরিশেষে, কান্নার জন্য নিজেকে কখনো দোষারোপ করা উচিত নয়।

 

জীবনের কঠিন অনুভূতির প্রতি চোখের জল ফেলা একটি অত্যন্ত সাহসী প্রতিক্রিয়া। নিজেকে কাঁদতে দিলে তা ক্লান্ত মস্তিষ্ককে একটি প্রয়োজনীয় বিরতি প্রদান করে এবং ভবিষ্যৎ জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অনেক বেশি সহজ করে তোলে।