তবে সমস্যাটি তখনই ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যখন এই গন্ধের তীব্রতা হঠাৎ করেই স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যায় কিংবা এর ধরনে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরনের আকস্মিক পরিবর্তনের নেপথ্যে থাকে আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্যাভ্যাস।
বিশেষ করে খাদ্যতালিকায় থাকা অতিরিক্ত আমিষ এবং গন্ধকযুক্ত খাবার যখন অন্ত্রের অণুজীব দ্বারা পচনের শিকার হয়, তখন সেখান থেকে অত্যন্ত তীব্র গন্ধযুক্ত বিপাকীয় গ্যাসীয় পদার্থ তৈরি হয়, যা মলত্যাগের সময় অস্বস্তিকর দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে।
তবে খাদ্যাভ্যাসের সাধারণ পরিবর্তনের বাইরেও এই দুর্গন্ধের পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে পরিপাকতন্ত্রের কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা। যদি কোনো ব্যক্তির মলের গন্ধে এই ধরনের তীব্র পরিবর্তন ক্রমাগত এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘটতে থাকে, তবে তা পরিপাকতন্ত্রের মারাত্মক কোনো হজম বা খাদ্য শোষণজনিত সমস্যার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত হতে পারে।
যদিও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে শুধুমাত্র মলের গন্ধ শুঁকে নির্দিষ্ট কোনো রোগ নির্ণয় করার সুযোগ নেই, তবুও এটি অনেক রোগের প্রাথমিক সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে যদি এই দুর্গন্ধ হঠাৎ করে তীব্র আকার ধারণ করে, তবে চিকিৎসকরা রোগীর মলের ধরন, এর রং, বাহ্যিক গঠন এবং শারীরিক অন্যান্য উপসর্গগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে সঠিক রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পেতে পারেন।
পরিপাকতন্ত্রের সার্বিক সুস্থতা নির্ধারণে মলের প্রকৃতি একটি নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে মলে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক।
আমাদের গ্রহণ করা খাদ্যের যে অংশটুকু পরিপাকতন্ত্র পুরোপুরি হজম বা শোষণ করতে পারে না, বিশেষ করে অপাচ্য আমিষ এবং নির্দিষ্ট কিছু শর্করা, সেগুলো সরাসরি আমাদের অন্ত্রে গিয়ে জমা হয়। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করা কোটি কোটি অণুজীব এই হজম না হওয়া খাবারগুলোকে ভেঙে ফেলে।
এই ভাঙন বা গাঁজন প্রক্রিয়ার সময় ওই অণুজীবগুলো এমন কিছু রাসায়নিক গ্যাস উৎপন্ন করে, যার কারণেই মূলত মলে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। যেহেতু এই অণুজীবজনিত গাঁজন প্রক্রিয়া হজমতন্ত্রের একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও অপরিহার্য অংশ, তাই প্রতিটি মানুষের মলেই কমবেশি গন্ধ থাকাটা অত্যন্ত প্রাকৃতিক।
তবে এই গন্ধের তীব্রতা এবং প্রকৃতি কেমন হবে, তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে একজন ব্যক্তির দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাস, তার অন্ত্রে থাকা অণুজীবের পরিমাণ ও ধরন এবং পরিপাকতন্ত্রের খাদ্য শোষণের সার্বিক দক্ষতার ওপর।
জৈব বর্জ্য ভাঙনের ওপর পরিচালিত আধুনিক রাসায়নিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, অন্ত্রের ক্ষুদ্র অণুজীবগুলো সহজেই বাতাসে মিশে যেতে পারে এমন রাসায়নিক যৌগ নিঃসরণের মাধ্যমেই মূলত এই তীব্র দুর্গন্ধ তৈরি করে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীর গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যখন অন্ত্রের অণুজীবগুলো হজম না হওয়া আমিষ এবং গন্ধক-সমৃদ্ধ খাবারগুলোকে গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পচাতে শুরু করে, তখন তারা হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস নির্গত করে।
মানুষের অন্ত্রের ভেতরের এই জটিল জৈবিক প্রক্রিয়াটি মূলত প্রকৃতিতে সাধারণ জৈব বর্জ্যের পচনের মতোই একটি নৈসর্গিক প্রক্রিয়া। মানবদেহে হজম না হওয়া পুষ্টি উপাদানের মাত্রা যখনই বেড়ে যায়, তখন সরাসরি অন্ত্রের গাঁজন প্রক্রিয়ার মাত্রাও বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলশ্রুতিতে মলের দুর্গন্ধও অনেক বেশি তীব্র ও প্রকট আকার ধারণ করে।
মলের গন্ধের ধরন বা প্রকৃতি আসলে ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক অবস্থার ইঙ্গিত দেয় কি না-এমন প্রশ্নের উত্তরে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা অত্যন্ত ইতিবাচক মত দিয়েছেন। মলের গন্ধের এই ভিন্নতা কেবল সাধারণ চোখে এড়িয়ে যাওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়, বরং এটি যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।
উদাহরণস্বরূপ, হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসটি মূলত অন্ত্রের নির্দিষ্ট কিছু অণুজীব দ্বারা বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত হয় এবং এর উপস্থিতির কারণে মলে এমন এক ধরনের উৎকট দুর্গন্ধ তৈরি হয়, যাকে অনেকেই পচা ডিমের তীব্র গন্ধের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন।
সাধারণত খাদ্যতালিকায় গন্ধকজাতীয় উপাদানের পরিমাণ খুব বেশি থাকলে এমনটা ঘটে থাকে। ডিম, লাল মাংস এবং ব্রোকলি কিংবা বাঁধাকপি গোত্রের সবজিগুলোতে প্রচুর পরিমাণে গন্ধক থাকে। এছাড়াও কোনো কারণে যদি অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের প্রাকৃতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসে, তবে সেটিও এ ধরনের পচা ডিমের মতো গন্ধ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে।
কখনও কখনও মলের ধরন ও গন্ধ অত্যন্ত জটিল এবং গুরুতর কোনো রোগের সুস্পষ্ট লক্ষণ হিসেবেও দেখা দিতে পারে। যদি দেখা যায় যে, মল দেখতে পুরোনো ও হালকা ধূসর বা ফ্যাকাশে রঙের, কমোডের পানিতে ভাসমান অবস্থায় থাকছে, শরীর থেকে বের হতে বেশ কষ্ট হচ্ছে এবং একই সঙ্গে তীব্র মাত্রায় দুর্গন্ধযুক্ত, তবে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় চর্বি শোষণে চরম অক্ষমতার একটি অত্যন্ত জোরালো লক্ষণ হতে পারে।
সহজ ভাষায়, এর মানে হলো রোগীর শরীর তার গ্রহণ করা খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় চর্বি সঠিকভাবে শোষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সাধারণ সাময়িক দুর্গন্ধের চেয়ে এই লক্ষণটি চিকিৎসাগত দিক থেকে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ধরনের সমস্যা মূলত মানুষের অগ্ন্যাশয়, পিত্তথলি অথবা ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে চর্বি শোষণের ক্ষমতার ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের শারীরিক জটিলতা বা অক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকতে পারে, যার জন্য দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া একান্ত আবশ্যক।
চর্বি শোষণে অক্ষমতার পাশাপাশি শর্করা হজমে অক্ষমতার কারণেও মলের গন্ধে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার হজম করতে না পারার শারীরিক অক্ষমতা, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দুগ্ধজাত শর্করা পরিপাকে অক্ষমতা বলা হয়, সেটি মূলত শর্করা শোষণে চরম ব্যর্থতা এবং শারীরিক অসহিষ্ণুতার সঙ্গেই গভীরভাবে সম্পর্কিত।
এই ধরনের শারীরিক অবস্থায় মলে এক ধরনের অত্যন্ত ঝাঁঝালো ও টক প্রকৃতির গন্ধ তৈরি হয়। চিকিৎসকদের মতে, মলের গন্ধ যদি দীর্ঘদিনের পরিবর্তে হঠাৎ করে বা রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে যায়, তবে সেটি চিকিৎসাগতভাবে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়।
কারণ এ ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রের মল গঠনের স্বাভাবিক পদ্ধতিতে অথবা অন্ত্রে থাকা অণুজীবের সার্বিক গঠনে আকস্মিক ও বড় ধরনের কোনো নেতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যা মোটেও অবহেলা করার মতো বিষয় নয়।
উপরিউক্ত শারীরিক জটিলতাগুলোর পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের কিছু অত্যন্ত সাধারণ ভুলের কারণেও মলে তীব্র গন্ধের সৃষ্টি হতে পারে। খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত আমিষ বা উচ্চ-গন্ধকযুক্ত খাবারের উপস্থিতি এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, শর্করা ভাঙার চেয়ে আমিষ ভাঙার ফলে অনেক বেশি পরিমাণে গন্ধ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক যৌগ তৈরি হয়। শরীরে পানিশূন্যতা বা পর্যাপ্ত পানি পানের অভাবও এর পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত।
পরিমিত পানি পান না করলে বর্জ্য অত্যন্ত ঘনীভূত ও শুষ্ক হয়ে যায়, যা স্বাভাবিকভাবেই এর দুর্গন্ধকে বহুগুণ তীব্র করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, কোনো অসুস্থতার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে জীবাণুনাশক ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার অনেক সময় অন্ত্রের অণুজীবের প্রাকৃতিক ও স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়।
ফলে অন্ত্রের নিজস্ব পরিবেশ পুনরায় সামঞ্জস্য করার অন্তর্বর্তীকালীন সময়টাতে সাময়িকভাবে গন্ধে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এছাড়াও নির্দিষ্ট কোনো খাবারের প্রতি সংবেদনশীলতা বা বৃহদন্ত্রে নির্দিষ্ট কিছু শর্করার অতিরিক্ত গাঁজনও তীব্র দুর্গন্ধের জন্য দায়ী হতে পারে।
সর্বশেষ কারণ হিসেবে কোষ্ঠকাঠিন্যের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা যায়। কোষ্ঠকাঠিন্য হলে বর্জ্য স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বৃহদন্ত্রে অবস্থান করে। এর ফলে অণুজীবগুলো সেই জমে থাকা বর্জ্যের ওপর কাজ করার এবং পচানোর জন্য অনেক বেশি সময় পেয়ে যায়, যা অনিবার্যভাবেই দুর্গন্ধকে চরম মাত্রায় তীব্র করে তোলে। তাই সুস্থতার জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও পরিমিত পানি পান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।