বহু অভিভাবকই এসব পণ্যের মোড়কের সামনে থাকা দৃষ্টিনন্দন নকশা, উজ্জ্বল রং এবং পুষ্টি সম্পর্কিত চমৎকার প্রচার দেখে সন্তানকে তা কিনে দিচ্ছেন। কিন্তু চমকপ্রদ মোড়কের নেপথ্যে আড়ালে থেকে যাওয়া পুষ্টিমানের অস্পষ্ট তথ্য কতটুকু নিরাপদ, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসায়ের মধ্যে শিশুদের স্বাস্থ্যগত অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে এখন প্রতিষ্ঠানগত পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়।
অথচ শিশুদের বিশাল খাদ্য বাজারে ব্যবসায়িক মুনাফার পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও তথ্যের স্বচ্ছতার বিষয়টি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে কার্যকর আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।
প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় সাধারণ অভিভাবকেরা মোড়কের সামনের দৃশ্যমান অংশ দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সেখানে বিভিন্ন ভিটামিন, শক্তি বৃদ্ধি কিংবা বিশেষ উপাদানের কথা অত্যন্ত স্পষ্ট হরফে প্রচার করা হয়।
কিন্তু খাবারের প্রকৃত মান বিচার করার জন্য অত্যন্ত জরুরি উপাদান-যেমন চর্বি, চিনি, লবণ বা ক্যালরি-সেসব তথ্য মোড়কের পেছনে ক্ষুদ্র অক্ষরে লেখা থাকে। সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে সময়ের অভাবে কিংবা পরিভাষার জটিলতায় পেছনের বিবরণী পড়ে বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ফলে খাদ্যে ঠিক কতটা চিনি বা চর্বি রয়েছে, তা না জেনেই অভিভাবকেরা তা সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছেন। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং তাদের সহযোগী উন্নয়ন সংস্থার অনুসন্ধানে প্রচলিত ২৪টি প্যাকেটজাত খাবারের পুষ্টিমান পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণাগার পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৪৬ শতাংশ পণ্যের মোড়কে সম্পৃক্ত চর্বির কোনো উল্লেখই ছিল না। এছাড়া মোট খাদ্যতন্তু ও রূপান্তরিত চর্বির তথ্য অনুপস্থিত ছিল ৩৮ শতাংশ পণ্যে। এমনকি ২১ শতাংশ পণ্যে চিনি ও লবণের পরিমাণের তথ্য মোড়কে প্রদান করা হয়নি।
গবেষণায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো পরীক্ষাগারে প্রাপ্ত পুষ্টিমানের সঙ্গে মোড়কে ঘোষিত তথ্যের বিশাল গরমিল। একটি চিপসের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাতে বিদ্যমান সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ মোড়কে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে প্রায় ৭৮০ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
একইভাবে বাজার থেকে সংগৃহীত চানাচুরের নমুনায় চিনির উপস্থিতি পাওয়া গেছে মোড়কে লেখা তথ্যের চেয়ে ১ হাজার ৬৪৪ শতাংশ বেশি। গবেষকদের মতে, প্যাকেটজাত খাবারের অসম্পূর্ণ পুষ্টি তথ্য ভোক্তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
পুষ্টিবিদ সাবিহা সুলতানার মতে, শুধুমাত্র মোড়কের সামনের বিজ্ঞাপনী প্রলোভনের ওপর নির্ভর করে শিশুদের জন্য খাবার কেনা ঝুঁকিপূর্ণ। একটি খাবার কতটুকু নিরাপদ তা বুঝতে মোড়কের পেছনের উপাদান তালিকার অনুক্রম লক্ষ্য করা জরুরি।
উপাদান তালিকার শুরুতে চিনি বা মিষ্টি জাতীয় উপাদানের নাম থাকার অর্থ হলো সেই খাবারে চিনির মাত্রা অত্যধিক। এছাড়া ক্ষতিকর রূপান্তরিত চর্বি, অতিরিক্ত লবণ এবং অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান রয়েছে কি না, তা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা উচিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘের শিশু তহবিলের জরিপ অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ২৪ শতাংশ খর্বকায় এবং ১৩ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায় সমস্যায় ভুগছে। এই অপুষ্টির পাশাপাশি অপরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাসের ফলে শিশুদের মধ্যে অতিওজন ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ছে।
এই দ্বিমুখী সংকটের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত খাবার বিপণন ও বিজ্ঞাপনী প্রচারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিশুদের লক্ষ্য করে পরিচালিত বিজ্ঞাপনগুলোতে কার্টুন চরিত্র, খেলোয়াড়, আকর্ষণীয় উপহার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব কাজে লাগানো হয়।
এসব প্রচারণা শিশুদের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করে, যার ফলে তারা সরাসরি মা-বাবার ক্রয় সিদ্ধান্তকে চালিত করে। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আফ্রিদা জান্নাতের মতো হাজারো শিশু বিজ্ঞাপনে অন্য শিশুদের খাবার খেতে দেখে অনুপ্রাণিত হয় এবং পরিবারের কাছে তা কেনার বায়না ধরে।
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা 'মনের বন্ধু'র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদা শিরোপার মতে, শিশুরা কেবল ক্ষুধা বা স্বাদের কারণে প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয় না। মোড়কের রঙিন রূপ, পছন্দের চরিত্র ও সুচতুর বিজ্ঞাপনী ভাষা তাদের পছন্দ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের সামনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছুটির সময় অস্থায়ী দোকানে সস্তা ও অস্বস্বাস্থ্যকর চিপস, কেক, বিস্কুট ও কোমল পানীয়ের পসরা সাজানো থাকে। কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে শিশুরা নিজেদের খরচের টাকা দিয়েই এসব খাবার কিনে গ্রহণ করছে।
অনেক অভিভাবকও সময়ের অভাব এবং শিশুর জেদের মুখে পড়ে মোড়কের পেছনের ক্ষতিকর উপাদানসমূহ না দেখেই এসব খাবার কিনে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক লাভ করার অধিকার থাকলেও, ভোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ তথ্য প্রদান করা তাদের নীতিগত বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।
শিশুদের জন্য বাজারজাত করা খাদ্যের নিরাপত্তা, মান পরীক্ষা, উপাদান ঘোষণার স্পষ্টতা এবং ক্ষতিকর পণ্য বাজার থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট সুশাসনমূলক ব্যবস্থা থাকা দায়িত্বশীল ব্যবসার পূর্বশর্ত।
শীর্ষস্থানীয় খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামালের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা সরকারি নির্ধারিত মানদণ্ড মেনেই পণ্যের মোড়ক প্রস্তুত করেন।
এতে পুষ্টিমান ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি পরিবেশগত দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তারা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণযোগ্য মোড়ক ব্যবহার এবং বর্জ্যের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করছেন।
তবে শিশু অধিকার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা কেবল কিছু মেধাবৃত্তি প্রদান বা সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। শিশু অধিকারকর্মী আব্দুল্লাহ হাসানের মতে, একটি প্রতিষ্ঠান যদি একদিকে শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে, আর অন্যদিকে তাদের মূল ব্যবসায়িক পণ্যে ক্ষতিকর ও পুষ্টিহীন খাবার বিক্রি করে, তবে তা নীতিশাস্ত্রের পরিপন্থী।
মূল ব্যবসা কীভাবে চালিত হচ্ছে এবং তা শিশুদের স্বাস্থ্যকে কীভাবে প্রভাবিত করছে-সেটাই আসল পরীক্ষার জায়গা। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কর্মকর্তা রেজিনা আক্তার জোর দিয়ে বলেছেন যে, খাদ্যপণ্যের মোড়কে ব্যবহৃত অণুবীক্ষণিক হরফ সাধারণ অভিভাবকদের বিভ্রান্ত করে।
এই অস্পষ্টতা দূর করে সহজ ভাষায় পুষ্টির চিত্র তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি, যেন অপুষ্টি ও অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা নিরাপদ খাদ্য পেতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর মালিহা শিফাসহ অন্যান্য পুষ্টিবিজ্ঞানীদের সুপারিশ হলো-প্যাকেটজাত খাবার পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়, তবে এই বাজারকে কঠোর তদারকি ও সঠিক তথ্যের আওতায় আনা আবশ্যক।
প্রতিটি পণ্যের মোড়কে চিনি, লবণ ও চর্বির পরিমাণ স্পষ্ট সংকেতের মাধ্যমে লেখা উচিত, যাতে সাধারণ অভিভাবক সহজেই তা অনুধাবন করতে পারেন। একইসঙ্গে দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের খাবারে বাড়তি চিনি বর্জন নিশ্চিত করা এবং শিশুদের উদ্দেশ্যে পরিচালিত বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের ওপর কঠোর তদারকি আরোপ করা প্রয়োজন।
পরিশেষে, শিশুদের প্লেটে প্রতিদিন কী খাবার যাচ্ছে, সেই চূড়ান্ত দায়িত্ব কেবল নিঃসঙ্গ কোনো অভিভাবকের নয়। এটি উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের সততা, সরকারের আইনি তদারকি এবং সচেতন নাগরিক সমাজের সম্মিলিত চেষ্টার ওপর নির্ভর করে।
প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকৃত মূল্যায়ন বার্ষিক ব্যয়ের খাতায় নয়, বরং প্রতিদিনের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে শিশুদের সার্বিক কল্যাণকে কতটুকু অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে-তার মাধ্যমেই নিরূপিত হওয়া উচিত।