তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের বাস্তবসম্মত, যুগোপযোগী এবং কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। বিশেষ করে দেশীয় শিল্পের চাহিদা পূরণ এবং বিদেশের শ্রমবাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করার লক্ষ্যে প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।
গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার দুপুরে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার দুপুরে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীমের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বঙ্গভবনে এই বিশেষ সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান।
দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের নানা দিক নিয়ে এই বৈঠকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও বিস্তৃত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এবং দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি এ সময় দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান নিয়ে তার গভীর পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, তাই আমাদের শিক্ষার্থীদেরও সেই বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
সাক্ষাৎকালে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন।
উপাচার্য জানান, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণায় কীভাবে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য কী ধরনের ল্যাবরেটরি ও গবেষণা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির সামনে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সেশনজট নিরসনে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর একটি সামগ্রিক চিত্রও উপস্থাপন করেন। উপাচার্যের বক্তব্য অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শোনার পর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সন্তোষ প্রকাশ করেন।
একই সঙ্গে তিনি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী নির্দেশনামূলক বার্তা প্রদান করেন। তিনি বলেন, আমাদের বর্তমান প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনো সাধারণ ও তাত্ত্বিক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, যা অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছে না।
এর ফলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার পরও হাজার হাজার তরুণ বেকারত্বের অভিশাপে ভুগছেন, যা একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো।
যে শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল বেকারত্ব সৃষ্টি করে এবং যা কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেই সনাতনী ধারা থেকে আমাদের ক্রমান্বয়ে সম্পূর্ণ রূপে বেরিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রপতি আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বলেন, একবিংশ শতাব্দীর এই পর্যায়ে এসে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যার মতো বিষয়গুলোতে আমাদের শিক্ষার্থীদের পারদর্শী করে তুলতে হবে। দেশের ভেতরে যেমন নতুন নতুন শিল্পকারখানা ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরেও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তির বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে।
আমাদের দেশের তরুণ সমাজ অত্যন্ত মেধাবী এবং পরিশ্রমী। তাদের যদি সঠিক প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দিকনির্দেশনা দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা যায়, তবে তারা কেবল দেশের অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করবে না, বরং বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশের সুনাম বহুগুণ বৃদ্ধি করবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে যুগান্তকারী অবদান রাখবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই ধরনের বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত গবেষণাধর্মী ও উদ্ভাবনী শিক্ষার প্রসার ঘটানো। শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানে সীমাবদ্ধ না রেখে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।
শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথ সংযোগ বা ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ’ স্থাপন করার ওপরও তিনি জোর দেন, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার আগেই কর্মক্ষেত্রের বাস্তব পরিবেশ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারে।
এর ফলে তারা স্নাতক শেষে খুব সহজেই যেকোনো পেশাদার পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম হবে। সৌজন্য সাক্ষাতের এক পর্যায়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন্ন সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে উত্থাপন করেন।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে এই গৌরবময় ও আনন্দঘন সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত এই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি যে নবীন স্নাতকদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস হবে, সে কথাও উপাচার্য অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ভাষায় ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তার গভীর অনুরাগের কথা ব্যক্ত করে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থাকার বিষয়ে প্রতিনিধিদলকে সদয় আশ্বাস প্রদান করেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য এক অত্যন্ত আনন্দের বার্তা বয়ে আনে।
অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও পেশাদার পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই সৌজন্য সাক্ষাৎপর্বে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব এবং রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব, যারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার নথিপত্র ও সার্বিক দিক তদারকি করেন।
অন্যদিকে, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ। তাদের উপস্থিতি এই বৈঠকটিকে আরও বেশি কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করে।
পরিশেষে এটি বলা যায় যে, রাষ্ট্রপতির এই দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা খাতের জন্য একটি নতুন পথের দিশা। বেকারত্ব দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে প্রায়োগিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং কারিগরি শিক্ষার যে রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন, তা বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বিশ্বদরবারে এক অদম্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদি রাষ্ট্রপতির এই সুচিন্তিত দর্শন ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে তাদের শিক্ষাক্রম পরিচালনা করে, তবে অচিরেই বাংলাদেশ একটি দক্ষ, স্বনির্ভর এবং উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।