বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা, গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী কারাগারে

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম

আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা, গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী কারাগারে
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় সংঘটিত এক তরুণীর রহস্যজনক আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের করা প্ররোচনার মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

 

মঙ্গলবার এক দিনের পুলিশি হেফাজত শেষে তাকে বিচারিক আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করা হলে বিচারক এই চূড়ান্ত নির্দেশ প্রদান করেন। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা এই আত্মহত্যার ঘটনাটি বর্তমানে আইনি কাঠামোর ভেতরে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তদন্তাধীন রয়েছে।

 

আদালত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পুলিশি হেফাজতে মাকসুদা ইসলামের জিজ্ঞাসাবাদের মেয়াদ সমাপ্ত হওয়ার পর তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত করা হয়। মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বিচারকের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদনপত্র জমা দেন।

 

ওই আবেদনে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই স্পর্শকাতর আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এবং প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য তদন্ত প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত মাকসুদা ইসলামকে কারাগারে অন্তরীণ রাখা একান্ত প্রয়োজন।

 

উভয় পক্ষের আইনি যুক্তিতর্ক এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন আসামিকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের উপ-পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমের কাছে আদালতের এই আদেশের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি সংবাদকর্মীদের জানান, তদন্ত কর্মকর্তার সুনির্দিষ্ট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত হাজতি পরোয়ানার মাধ্যমে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, শুনানিকালে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের তরফ থেকে জামিন চেয়ে কোনো প্রকার আইনি আবেদন আদালতে উত্থাপন করা হয়নি।

 

উল্লেখ্য, আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এর আগে গতকাল আদালত মাকসুদা ইসলামের এক দিনের পুলিশি হেফাজত মঞ্জুর করেছিলেন। অন্যদিকে, এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত এবং নিহতের স্বামী সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আগেই চার দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে।

 

চাঞ্চল্যকর এই মামলার মূল ঘটনাটি সংঘটিত হয় গত রোববার। এদিন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার আওতাধীন জাতীয় সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাসভবন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর কক্ষ থেকে সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী, মাত্র উনিশ বছর বয়সী মোছা. মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

সরকারি সুরক্ষিত বাসভবনের ভেতরে একজন সংসদ সদস্যের স্ত্রীর এমন মর্মান্তিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এই বিষাদময় ঘটনার অব্যবহিত পরেই নিহত মরিয়ম খাতুনের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ চরম শোক ও ক্ষোভ নিয়ে বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন।

 

পুলিশ প্রশাসনের কাছে দায়ের করা এজাহারে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে তিনজনকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তারা হলেন-নিহতের স্বামী সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং নিহতের আপন মামা ও সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান।

 

আপন মামার বিরুদ্ধে ভাগনির আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগটি এই মামলাটিকে আরও বেশি জটিল ও রহস্যময় করে তুলেছে। দায়ের করা মামলার এজাহার থেকে নিহত মরিয়ম খাতুনের দুর্বিষহ দাম্পত্য জীবনের এক করুণ চিত্র উঠে এসেছে।

 

মামলার বিবরণীতে নিহতের বাবা উল্লেখ করেছেন যে, চলতি বছরের জুন মাসে অভিযুক্ত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক তার মেয়ে মরিয়ম খাতুনের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

 

গাজী নজরুল ইসলাম একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য হওয়ায় বিয়ের পর থেকে ভুক্তভোগী মরিয়ম এবং সংসদ সদস্যের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম একসঙ্গে শেরেবাংলা নগর থানাধীন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় অবস্থিত সংসদ ভবনের ঠিক বিপরীত পাশের ন্যাম ভবনের ওই সুনির্দিষ্ট বাসগৃহে বসবাস করতে শুরু করেন।

 

এজাহারে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে যে, মামলার তৃতীয় আসামি ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও মধ্যস্থতাতেই সংসদ সদস্যের সঙ্গে তরুণী মরিয়মের এই অসম বিয়েটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই মরিয়মের জীবনে নেমে আসে চরম অবহেলা ও নির্যাতনের অমানিশা।

 

নিহতের বাবার অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই স্বামী গাজী নজরুল এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বিভিন্ন পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মরিয়মকে ক্রমাগত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন।

 

ভুক্তভোগী তরুণী জীবিত অবস্থায় মুঠোফোনের মাধ্যমে একাধিকবার তার নিজ পরিবারকে এই অমানবিক নির্যাতনের কথা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানিয়েছিলেন, যা এখন মামলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

 

নির্যাতনের এই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত ও মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে গত ২০ সেপ্টেম্বর। মামলার বাদীর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দিন বিকেল আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার দিকে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম তার শ্বশুর, অর্থাৎ ভুক্তভোগীর বাবাকে মুঠোফোনে কল করে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে তাদের ন্যাম ভবনের বাসায় ছুটে যেতে বলেন।

 

মেয়ের স্বামীর কাছ থেকে এমন আকস্মিক ও রহস্যজনক ডাক পেয়ে মাসুম বিল্লাহ চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে দ্রুত ওই ভবনে উপস্থিত হন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, কক্ষের ভেতরে আগে থেকেই অনেক অপরিচিত ও পরিচিত লোকজন ভিড় করে আছেন এবং ভেতরের একটি ঘরের দরজা ভেতর থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ করা রয়েছে।

 

উপস্থিত লোকজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে, বন্ধ ঘরের ভেতরে তার মেয়ে মরিয়ম ঝুলন্ত পাখার সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছেন। পরিস্থিতি অনুধাবন করে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশকে খবর দেন।

 

পরবর্তীতে পুলিশের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ও উপস্থিতিতে সেই বন্ধ ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা হয়। ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেই মাসুম বিল্লাহ তার মেয়ের নিথর দেহ পাখার সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। সে সময় পুলিশ মৃতদেহের বিছানার ওপর থেকে নিহতের নিজ হাতে লেখা একটি মৃত্যুপূর্ব চিরকুট উদ্ধার করে, যা তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

মামলার এজাহারে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, আসামিদের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং তাদের ক্রমাগত প্রত্যক্ষ প্ররোচনার শিকার হয়েই ওই তরুণী এমন চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

 

এই আত্মহত্যার ঘটনার পেছনে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে নিহত মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের বেশ কয়েকটি ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকস্মিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

 

এই আপত্তিকর দৃশ্যগুলো প্রকাশ্যে আসার পর জাতীয় রাজনীতি ও সামাজিক অঙ্গনে তাকে ঘিরে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। এই নৈতিক স্খলনের বিষয়টি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আসার পর দলটির অভ্যন্তরে একটি সাংগঠনিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

 

সেই তদন্তে নৈতিক স্খলনের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় গত ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্যকে দল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির নিজস্ব গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা কঠোরভাবে প্রয়োগ করে এই বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে দেশের নির্বাচন কমিশনকেও আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা অবহিত করা হয়েছিল।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই স্পর্শকাতর দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এই পরিবারটিকে ঘিরে আইনি জটিলতা বাড়তে থাকে। ঘটনার প্রতিবাদ এবং ওই দৃশ্য ফাঁসের সন্দেহে গত ২১ জুলাই নিহত মরিয়মের মামা এবং সংসদ সদস্যের গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান নিজেই বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন।

 

ওই মামলায় তিনি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে তাকে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগ এনেছিলেন। সেই হত্যাচেষ্টা মামলায় আইনি লড়াই চালিয়ে গত ১০ আগস্ট উচ্চ আদালত থেকে আট সপ্তাহের জন্য আগাম জামিন লাভ করেছিলেন গাজী নজরুল ইসলাম।

 

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো, যে ওবায়দুর রহমান মাত্র দুই মাস আগে ভাগনির সম্মান রক্ষার্থে বা অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ জানিয়ে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেছিলেন, আজ সেই ওবায়দুর রহমানকেই আপন ভাগনির আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে।

 

পারিবারিক কলহ, রাজনৈতিক পতন, সামাজিক সম্মানহানি এবং ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনের মতো নানামুখী জটিলতার এক চরম বিষাদময় পরিণতি হলো উনিশ বছর বয়সী তরুণী মরিয়ম খাতুনের এই মর্মান্তিক মৃত্যু। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদার তদন্তের মাধ্যমেই এই চাঞ্চল্যকর আত্মহত্যার পেছনের প্রকৃত সত্য ও আইনি বিচার নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সকলেই।