মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সদর দপ্তরে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ এই পর্বের সূচনা ঘটে। বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারণ বিতর্কের এই উদ্বোধনী অধিবেশনে অত্যন্ত সগর্বে ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।
আন্তর্জাতিক শান্তি, বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষা এবং চলমান বহুমুখী বৈশ্বিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের নিয়ে এই উচ্চপর্যায়ের বিতর্কের আয়োজন করা হয়।
জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে বৈশ্বিক সংঘাত নিরসন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবাধিকার রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও যুগান্তকারী বিষয়গুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বাংলাদেশের শীর্ষ নির্বাহীর এই সশরীরে উপস্থিতি বহির্বিশ্বে দেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় ও সুসংহত করার একটি বিশাল পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মূল অধিবেশন ও বিতর্কের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর ঠিক আগে, এদিন সকালে বৈশ্বিক কূটনীতির চিরায়ত প্রথা ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুসরণ করে এক বিশেষ কূটনৈতিক প্রাতরাশের আয়োজন করা হয়। জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাধারণ পরিষদের এই ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে আসা বিশ্বনেতা এবং তাদের সফরসঙ্গীদের প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মান ও আতিথেয়তা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে এই ঐতিহ্যবাহী স্বাগত প্রাতরাশ বা ওয়েলকাম ব্রেকফাস্টের আয়োজক ছিলেন।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকাল ঠিক সাড়ে সাতটায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের অত্যন্ত সুসজ্জিত ও নির্ধারিত লাউঞ্জে আয়োজিত এই সম্মানজনক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশ্বিক আয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি বৃদ্ধি এবং অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়ের এক অনন্য ও অত্যন্ত কার্যকর সুযোগ তৈরি করে জাতিসংঘের এই প্রাতরাশ আয়োজন।
এই প্রাতরাশ আয়োজনের ফাঁকে সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে বিশ্বনেতারা পরস্পরের সঙ্গে যে কুশল বিনিময় করেন, তা পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক তথ্যবিবরণী থেকে জানা যায় যে, বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের বহুমাত্রিক লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে গত ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম এই অধিবেশনের পর্দা ওঠে।
তবে নিয়মানুযায়ী অধিবেশনের প্রথম কয়েক দিন সদস্য দেশগুলোর বিভিন্ন প্রশাসনিক, পদ্ধতিগত ও সাংগঠনিক বিষয়াবলি নিষ্পন্ন করা হয়ে থাকে। বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণে যে মূল আকর্ষণ, অর্থাৎ যে অধিবেশনে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা সশরীরে উপস্থিত হয়ে বৈশ্বিক সংকট নিয়ে সরাসরি ভাষণ দেন এবং পরস্পরের বক্তব্য অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শোনেন, সেই কাঙ্ক্ষিত সাধারণ বিতর্ক পর্বটি মূলত আজ ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার থেকেই পূর্ণাঙ্গরূপে শুরু হয়েছে।
আগামী কয়েক দিন ধরে বিশ্বনেতারা এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজ নিজ দেশের স্বার্থ, জাতীয় আকাঙ্ক্ষা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজেদের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্তভাবে তুলে ধরবেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের এই জাতিসংঘ সফর বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বিশেষ ও সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব বহন করছে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এবং সাধারণ মানুষের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার পবিত্র দায়িত্বে আসার পর বিশ্বমঞ্চে তথা জাতিসংঘের মতো সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ফোরামে এটিই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ।
বিশ্বনেতাদের এই সর্ববৃহৎ মিলনমেলায় তিনি মূলত বাংলাদেশের গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের নিরবচ্ছিন্ন সুরক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক সুদৃঢ় ও সুস্পষ্ট বার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের ভবিষ্যৎ রূপকল্প ঠিক কেমন হওয়া উচিত এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ সুরক্ষিত রাখা সম্ভব, সেই বিষয়গুলোই এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার সগর্ব উপস্থিতির মাধ্যমে আরও বেশি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যখন বহুমুখী সংকট, ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের মতো অত্যন্ত কঠিন ও জটিল চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই সাধারণ পরিষদের এই ৮১তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এই কঠিন বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ বরাবরই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে সর্বোচ্চ মাত্রায় অবদান রাখা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও সনদের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এসেছে।
সাধারণ বিতর্কের এই মঞ্চে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের সেই চিরায়ত শান্তিকামী ও উন্নয়নমুখী পররাষ্ট্রনীতির কথাই অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করবেন।
এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অস্তিত্বের যে চরম সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি তিনি তুলে ধরবেন। উন্নত দেশগুলো থেকে জলবায়ু অর্থায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার দ্রুত, টেকসই ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে তিনি বিশ্বনেতাদের গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করবেন বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
সাধারণ বিতর্কের এই বর্ণাঢ্য ও ঐতিহাসিক উদ্বোধনী অধিবেশনে উপস্থিত থাকার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মূলত বিশ্বের অন্যান্য বৃহৎ পরাশক্তি এবং মিত্র দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ নীতিগত অবস্থানের বিষয়ে সরাসরি অবগত হওয়ার বিরল সুযোগ পাচ্ছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার উদ্বোধনী ভাষণে সংঘাত এড়িয়ে বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার যে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলও সেই বহুপাক্ষিক কাঠামো ও বৈশ্বিক ঐক্যের প্রতি নিজেদের পূর্ণ সমর্থন ও অবিচল আস্থা ব্যক্ত করেছে।
নিউইয়র্কের এই বহুমাত্রিক আবহে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের এক ছাদের নিচে সমবেত হওয়াটা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এটি বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন, পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি দূরীকরণ এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এক বিশাল ও উন্মুক্ত দ্বার উন্মোচন করে দেয়।
এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক কূটনীতিকেও বহির্বিশ্বে আরও প্রসারিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পরিশেষে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের এই উদ্বোধনী পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সগর্ব উপস্থিতি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ের এক অত্যন্ত উজ্জ্বল সূচনা করেছে।
আগামী দিনগুলোতে এই অধিবেশনের মূল মঞ্চে তিনি যখন তার বহুল প্রতীক্ষিত আনুষ্ঠানিক ভাষণ প্রদান করবেন এবং সাইডলাইনে বা অধিবেশনের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণ করবেন, তখন তা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বিশ্ব শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অসামান্য অবদান এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার যে দৃঢ় অঙ্গীকার, তা এই অধিবেশনের প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হবে বলে দেশের আপামর জনসাধারণ এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।