সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসিবি চত্বরে স্টুডিওতে সংঘবদ্ধ হামলা: নেপথ্যে জমি দখলের বিবাদ, গ্রেপ্তার তিন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

ইসিবি চত্বরে স্টুডিওতে সংঘবদ্ধ হামলা: নেপথ্যে জমি দখলের বিবাদ, গ্রেপ্তার তিন
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার ইসিবি চত্বর সংলগ্ন নিউ গিনি প্রপার্টিজে অবস্থিত জনপ্রিয় ভিডিও নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী সালমান মুক্তাদিরের চিত্রগ্রহণের স্টুডিওতে গভীর রাতে সংঘটিত ভয়াবহ হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্বরোচিত ঘটনার নেপথ্যে মূলত জমির দখল ও বেদখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের কোনো পুঞ্জীভূত বিবাদ বা স্বার্থান্বেষী মহলের দ্বন্দ্ব থাকতে পারে।

 

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে চাঁদাবাজির যে গুঞ্জন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, তার কোনো সুস্পষ্ট সত্যতা বা প্রমাণ এখনো পর্যন্ত পুলিশ বাহিনীর হাতে আসেনি। রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর নিউ গিনি প্রপার্টিজের ওই ক্ষতিগ্রস্ত ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তদন্তের এই প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো অত্যন্ত পেশাদারত্বের সাথে তুলে ধরেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আদলে এই ঘটনার প্রতিটি দিক এখন নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ঘটা বর্বরোচিত এই হামলার বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করেন।

 

তিনি জানান, শনিবার দিবাগত গভীর রাতে অজ্ঞাতপরিচয় একদল দুর্বৃত্ত সম্পূর্ণ সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিতভাবে উক্ত আবাসন প্রকল্প এলাকায় আকস্মিক আক্রমণ চালায়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করা।

 

তবে ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই বাংলাদেশ পুলিশের স্থানীয় ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শক (তদন্ত), পরিদর্শক (অভিযান) সহ বিপুল সংখ্যক চৌকস পুলিশ সদস্যের একটি বিশেষ দল বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়।

 

পুলিশের এই তাৎক্ষণিক ও সময়োচিত সাহসী পদক্ষেপে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসে, যার ফলে দুর্বৃত্তরা তাদের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য হাসিল করতে ব্যর্থ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ঘটনাস্থল থেকেই সন্দেহভাজন দুজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন।

 

পরবর্তীতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার পর রাতেই আশপাশের এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে আরও একজনকে আইনের আওতায় আনা হয়। সব মিলিয়ে এই ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদের ধরতে পুলিশের একাধিক চৌকস দল নিরবচ্ছিন্নভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে।

 

গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের পরিচয় এবং তাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে তদন্তকারী কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন। যুগ্ম পুলিশ কমিশনার গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, গ্রেপ্তারকৃত তিনজনের মধ্যে একজনের নাম মামুন, যার পৈতৃক নিবাস ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলায় হলেও তিনি বর্তমানে রাজধানীর ভাসানটেক বস্তি এলাকায় বসবাস করেন।

 

দ্বিতীয়জন হলেন আসলাম, টাঙ্গাইল জেলার আদি বাসিন্দা এই যুবক পেশায় একজন সাধারণ অটোরিকশা চালক। এছাড়া মুন্না নামের তৃতীয় যে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনিও ভাসানটেক বস্তিরই আরেকজন ভাসমান বাসিন্দা।

 

আসামিদের এই আর্থসামাজিক পরিচয় থেকে অপরাধ বিশ্লেষক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রাথমিক ধারণা জন্মেছে যে, এরা মূলত ভাড়ায় খাটা প্রান্তিক স্তরের অপরাধী। নেপথ্যের কোনো প্রভাবশালী মহল বা সংঘবদ্ধ ভূমিদস্যু চক্র নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অর্থের বিনিময়ে এই হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাতের অন্ধকারে এমন সুপরিকল্পিত হামলা ও তাণ্ডব চালিয়েছে।

 

পুলিশ বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়ে এই আসামিদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে, যেন তাদের পেছনের মূল নির্দেশদাতাদের পরিচয় দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনসমক্ষে উন্মোচন করা সম্ভব হয়।

 

হামলার মূল কারণ সম্পর্কে সাংবাদিকদের নানামুখী ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার অত্যন্ত সতর্ক ও পেশাদার মনোভাব পোষণ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঘটনাটি এখনো প্রাথমিক তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে, তাই এখনই কোনো ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সমীচীন হবে না।

 

তবে সার্বিক পরিস্থিতি, ঘটনাস্থলের পরিবেশ এবং গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের দৃঢ় সন্দেহ, এই পুরো ঘটনার সাথে একটি উঠতি আবাসন ব্যবসার গভীর সংযোগ রয়েছে।

 

রাতের অন্ধকারে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সম্পূর্ণ সংঘবদ্ধ হয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আকস্মিক আক্রমণ চালানোর ধরনটি পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, এর পেছনে জমিজমা সংক্রান্ত কোনো বড় ধরনের বিরোধ বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে অন্যের মহামূল্যবান সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করার এক সুগভীর ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে।

 

একটি উদীয়মান আবাসন প্রকল্পের স্থানে এমন হামলা সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার বা পূর্বশত্রুতার জের ধরেই ঘটে থাকে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন উক্ত সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, পূর্ববর্তী কোনো আইনি বিরোধ, আদালতে চলমান কোনো মামলা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার দিকগুলো অত্যন্ত গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন।

 

এ পর্যায়ে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, সাহসী ও জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর নিউ গিনি প্রপার্টিজ, রাড্ডা হাসপাতাল প্রাঙ্গণ এবং মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একের পর এক দখল ও লুটপাটের ঘটনার প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করে এক সাংবাদিক জানতে চান, রাজধানী ঢাকা শহর কি তবে ধীরে ধীরে লুটেরা এবং অবৈধ দখলদারদের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হতে চলেছে?

 

এমন সরাসরি প্রশ্নের জবাবে যুগ্ম পুলিশ কমিশনার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনী যেকোনো ধরনের অরাজকতা দমনে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সাড়া দিচ্ছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বিন্দুমাত্র পিছপা হচ্ছে না।

 

বর্তমান ঘটনাটির ব্যাপকতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি নিজে পুলিশের একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে ঘটনাস্থল নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করেছেন এবং প্রতিটি আলামত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

 

তিনি দেশবাসীকে সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত করে বলেন, ঢাকা শহরের কোথাও কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নীরব বসে নেই; বরং প্রতিটি ঘটনাই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ঘাটন করা হচ্ছে এবং অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার আইনি প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রয়েছে।

 

আলোচিত এই হামলার ঘটনায় জনপ্রিয় ভিডিও নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের সম্পৃক্ততা এবং তাঁর কাছে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে জনমনে যে ব্যাপক ধোঁয়াশা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, শীর্ষ এই পুলিশ কর্মকর্তা তা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নিরসন করেছেন।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, পুলিশের চলমান তদন্তে বা প্রাথমিক অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত চাঁদা দাবির মতো কোনো ধরনের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, অভিযোগ বা প্রমাণ উঠে আসেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিত্তিহীন গুজব বা অসত্য তথ্যের ওপর নির্ভর করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত কাজ পরিচালিত হয় না, বরং পুলিশ সম্পূর্ণভাবে সংগৃহীত আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করে তাদের আইনি কার্যক্রম সামনের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

 

প্রাথমিকভাবে পুলিশের কাছে এটি সম্পূর্ণভাবে জমিজমা সংক্রান্ত দুই বা ততোধিক বিবাদমান গোষ্ঠীর মধ্যকার একটি অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের মহড়া বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। তবে তিনি গণমাধ্যমের সামনে এও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, একটি অত্যন্ত সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেই প্রকৃত সত্য এবং নেপথ্যের সকল লুক্কায়িত রহস্য জাতির সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচিত করা সম্ভব হবে।

 

সার্বিকভাবে, রাজধানীর বুকে রাতের অন্ধকারে সংঘটিত এই ন্যাক্কারজনক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাটি দেশের সাধারণ নাগরিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে যে সাময়িক নিরাপত্তাহীনতা ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল, পুলিশের দ্রুত ও সময়োচিত হস্তক্ষেপ তা অনেকটাই প্রশমিত করতে সক্ষম হয়েছে।

 

দেশের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে এখন সকলেই একটি স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত প্রক্রিয়ার দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এই ঐকান্তিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন যে, অপরাধী যে-ই হোক না কেন এবং তারা যত প্রভাবশালী রাজনৈতিক বা সামাজিক মহলেরই ছত্রছায়ায় থাকুক না কেন, উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাদের প্রত্যেককে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।

 

এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজধানী ঢাকায় একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য এবং সম্পূর্ণ দখলমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুলিশের শূন্য সহনশীলতা নীতি বা জিরো টলারেন্স আরও একবার কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সকল মহল গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন। পুলিশ প্রশাসন জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ।