সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি সরবরাহ দ্রুতই স্বাভাবিক হচ্ছে: বিদ্যুৎ মন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম

জ্বালানি সরবরাহ দ্রুতই স্বাভাবিক হচ্ছে: বিদ্যুৎ মন্ত্রী
ছবি : Collected

বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা ও অপ্রত্যাশিত কারিগরি জটিলতার মেঘ কাটিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত পুনরায় স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসছে বলে আশ্বস্ত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

 

রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ সচিবালয়ে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের সাথে এক বিশেষ ব্রিফিংকালে তিনি দেশের বিদ্যমান জ্বালানি পরিস্থিতি, সাময়িক সংকট সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ এবং তা নিরসনে গৃহীত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি স্পষ্ট জানান যে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি হওয়া অভূতপূর্ব সরবরাহ সংকট এবং দেশের ভেতরের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কারণে সাময়িকভাবে যেসব প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন সিংহভাগ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।

 

বর্তমানে আমদানিকৃত জ্বালানির জাহাজসমূহ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী দেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে, যার ফলে অচিরেই সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্থিতিশীল রূপ ধারণ করবে।

 

বিদ্যমান সংকটের আন্তর্জাতিক পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির সংবেদনশীল দিকগুলো উন্মোচন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সামরিক সংঘাত এবং তৎসংক্রান্ত আঞ্চলিক অস্থিরতা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।

 

ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্য হলো পুরো বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রপ্তানি কেন্দ্র। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হওয়া মাত্রই বৈশ্বিক সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে এবং সার্বিক জ্বালানি আহরণ প্রক্রিয়ায় এক বড় ধরণের জটিলতার সৃষ্টি হয়।

 

এই হঠাৎ তৈরি হওয়া ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর, কারণ চুক্তিবদ্ধ জ্বালানি বহনে আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিবহন সংস্থাগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকির দোহাই দিয়ে যাত্রা বিলম্বিত করতে বাধ্য হয়।

 

জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়ায় বাহ্যিক ও স্থানীয় প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে সফলভাবে জ্বালানি ক্রয়ের চুক্তি সম্পাদন করার পরও ভৌগোলিক দূরত্ব ও সামুদ্রিক সীমান্ত পরিবহনের জটিলতার কারণে যথাসময়ে তা দেশে নিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক সরবরাহের এই জটিলতার পাশাপাশি দেশের ভেতরেও একটি বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত বিপত্তি ঘটে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটে (এফএসআরইউ) হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

 

এই কারিগরি দুর্ঘটনার ফলে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছিল, তা সাময়িকভাবে মারাত্মক বিঘ্নিত হয়। এই জোড়া ধাক্কার কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাস ও গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে কাঁচামালের এক সাময়িক বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিল্পকারখানার উৎপাদনে।

 

বিদ্যুৎ মন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে দেশের সাধারণ নাগরিকদের সাময়িক কষ্টের বিষয়টি স্বীকার করেন এবং ব্যাখ্যা করেন যে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট মোটেও সরকারের কোনো ইচ্ছেকৃত গাফিলতি বা অব্যবস্থাপনার কারণে তৈরি হয়নি।

 

বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলোও যখন বিশ্ববাজারের এই সাময়িক তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি ও সরবরাহের ঘাটতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশ সরকারও একই বৈশ্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল। এই হঠাৎ তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এক মুহূর্তে অলস বসে থাকেনি।

 

আন্তর্জাতিক বাজারের বৈরী পরিবেশ সত্ত্বেও বিকল্প উৎস থেকে তড়িঘড়ি জ্বালানি ক্রয়ের প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়। মন্ত্রী স্পষ্ট জানান, দেশীয় চাহিদার কথা বিবেচনা করে এবং জনভোগান্তি যত দূর সম্ভব দ্রুত লাঘব করার স্বার্থে সরকার উচ্চ আন্তর্জাতিক বাজারদর ও অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করেও গ্যাস ও জ্বালানি তেল ক্রয়ের ব্যবস্থা করেছে, যেন জাতীয় অর্থনীতি স্থবির না হয়ে পড়ে।

 

সংকট নিরসনে দ্রুততম পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং সংকট নিরসনে তাৎক্ষণিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।

 

শীর্ষ পর্যায়ের প্রত্যক্ষ সমন্বয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সম্মিলিত ও সমন্বিত দলগত প্রচেষ্টার ফলেই এই বিশাল প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রতিবন্ধকতা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হয়েছে।

 

সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে আন্তর্জাতিক বিকল্প উৎসসমূহ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন পুনরায় সচল করা সম্ভব হয়েছে। একই সাথে দুর্ঘটনাকবলিত এফএসআরইউ ইউনিটটির দ্রুত মেরামত নিশ্চিত করে তা পুনর্কার্যক্ষম করার সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

 

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা দিয়ে মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দীর্ঘ চেষ্টার পর অবশেষে সাময়িক দুর্যোগ ও দূরভিসন্ধিমূলক প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে জ্বালানি আমদানির মূল শিপিং লাইন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।

 

জ্বালানিবাহী নতুন জাহাজগুলো নির্ধারিত সময়সূচি মেনে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে নোঙর করা শুরু করেছে এবং জাতীয় গ্রিডে তা নিয়মিত প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস করার মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রাথমিক জ্বালানির প্রাপ্যতা এখন অনেকটাই নিশ্চিত করা গেছে।

 

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস ব্যক্ত করেন যে, যদি নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বৈশ্বিক যুদ্ধের নতুন সামরিক উন্মাদনা কিংবা বড় কোনো কারিগরি দুর্ঘটনা পুনরায় না ঘটে, তবে আগামী দিনগুলোতে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পূর্ণমাত্রায় নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

 

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, দেশের জনগণ এক অকৃত্রিম আস্থা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে এই সরকারকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। তাই জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গভীর।

 

যেকোনো ধরনের নাগরিক কষ্ট বা সাময়িক অচলবস্থা সরকারকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধাবস্থা ও আকস্মিক কারিগরি দুর্ঘটনার যৌথ প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া এই সরবরাহ ঘাটতি কাটিয়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করতে কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়াটা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।

 

তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তৈরি হওয়া একই ধরনের সাময়িক সংকট কেবল বাংলাদেশে নয়, বরং পৃথিবীর অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেও সমানভাবে প্রভাব ফেলেছে। সংবাদ ব্রিফিংয়ের শেষভাগে মন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে, সরকার সর্বদা দেশের প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বা কারিগরি দুর্ঘটনার কারণে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা পুনরায় হুমকিতে না পড়ে, সে জন্য সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে করে দেশে বিকল্প জ্বালানি মজুত ব্যবস্থা জোরদার করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

তিনি দেশের সর্বস্তরের জনগণকে উদ্ভূত সংকটকালীন সময়ে অসীম ধৈর্য ও সহযোগিতার পরিচয় দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং আশ্বস্ত করেন যে সরকারের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান ও সময়োপযোগী পদক্ষেপে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাময়িক অচলবস্থার মেঘ পুরোপুরি কেটে গেছে। আগামী দিনগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও মসৃণ ও নির্বিঘ্ন হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।