সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র সোমবারই সংস্কার শুরু, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র সোমবারই সংস্কার শুরু, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
ছবি : Collected

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুর-১ এলাকায় অবস্থিত অত্যন্ত পরিচিত, ঐতিহ্যবাহী এবং সর্বজনস্বীকৃত একটি চিকিৎসাকেন্দ্র হলো ‘রাড্ডা মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র’। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এলাকার অসহায়, দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছে এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটি।

 

বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণ এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটি একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল হিসেবে সর্বমহলে সুপরিচিত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, সম্প্রতি রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে একদল দুর্বৃত্ত ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিতে এক ভয়াবহ ও বর্বরোচিত ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

 

এই ন্যক্কারজনক ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। এমন একটি উত্তপ্ত ও সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে রোববার, সাতাশে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি সরাসরি পরিদর্শনে যান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

 

সেখানে উপস্থিত হয়ে পুরো পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ শেষে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, সোমবার অর্থাৎ আটাশে সেপ্টেম্বর থেকেই কেন্দ্রটির সংস্কারকাজ পুরোদমে শুরু করা হবে এবং কোনো অবস্থাতেই এই চিকিৎসাকেন্দ্রের অপরিহার্য সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না।

 

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া চিকিৎসাকেন্দ্রটির ভগ্নদশা ঘুরে দেখার সময় প্রতিমন্ত্রীর চোখেমুখে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তিনি তাঁর গভীর মর্মাহত অনুভূতির কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে যে প্রতিষ্ঠানটি মানবসেবার মহান ব্রত নিয়ে এই এলাকার সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছে, তার ওপর এমন অমানবিক ও নিষ্ঠুর হামলা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ মেনে নিতে পারে না।

 

রাতের অন্ধকারে ভারী যন্ত্রপাতির সাহায্যে দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাকেন্দ্রকে আক্ষরিক অর্থেই মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার এই ঘৃণ্য অপচেষ্টা কেবল একটি ভবনের ওপর হামলা নয়; বরং এটি এই এলাকার হাজারো দুস্থ ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার মৌলিক অধিকারের ওপর এক চরম আঘাত।

 

প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এই পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষের চিকিৎসা কার্যক্রম যেন একদিনের জন্যও বন্ধ না থাকে, সে বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

 

তাঁর নিজস্ব তত্ত্বাবধানে এবং সার্বিক সহযোগিতায় যত দ্রুত সম্ভব এই কেন্দ্রটিকে পুনরায় আগের রূপে ফিরিয়ে আনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি মানবকল্যাণমূলক ও চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন ভয়াবহ হামলার পর স্বাভাবিকভাবেই আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দেয়।

 

এই প্রসঙ্গে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন মনোভাব পোষণ করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, এ ধরনের বেআইনি ও জনবিরোধী কর্মকাণ্ডকে সরকার কখনোই সামান্যতম প্রশ্রয় দেবে না।

 

জনরোষ ও সমালোচনার মুখে এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের প্রাথমিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চরম ব্যর্থতা এবং দায়িত্ব পালনে দৃশ্যমান অবহেলার গুরুতর অভিযোগে স্থানীয় শাহ আলী এলাকার প্রশাসনিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি এই নজিরবিহীন ঘটনার নেপথ্যে প্রকৃত অপরাধী কারা, তাদের শনাক্ত করতে তদন্তকারী একাধিক চৌকস দল অত্যন্ত নিবিড়ভাবে মাঠে কাজ করছে। রাতের অন্ধকারে সংঘটিত এমন একটি পরিকল্পিত হামলার পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের ইন্ধন রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গভীর তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে যখন প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় যে, এই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে সরকারদলীয় কোনো প্রভাবশালী নেতাকর্মী বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না এবং এতে সরকার বিব্রত কি না, তখন প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত স্বচ্ছ ও পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তার উত্তর প্রদান করেন।

 

তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, গণমাধ্যমে এবং জনশ্রুতিতে দলের কিছু স্থানীয় নেতাকর্মী ও এলাকার একজন সংসদ সদস্যের নামও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে উচ্চারিত হচ্ছে। তবে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, বর্তমান সরকার এবং তাদের দল কোনো অপরাধীকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে আশ্রয় প্রশ্রয় দেবে না।

 

সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো বিষয়টির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কোনো ধরনের সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

 

তবুও তিনি কঠোর ভাষায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, যদি ভবিষ্যতের যেকোনো পর্যায়ের তদন্তে দলের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তির সামান্যতম সংশ্লিষ্টতাও প্রমাণিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পেছনে জমি দখলের যে হীন উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত বিশ্লেষণমূলক আলোচনা করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, যে মূল্যবান জায়গার ওপর এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দীর্ঘকাল ধরে অবস্থিত, সেটি মূলত সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সম্পত্তি।

 

সুতরাং, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর যদি এই জমির ওপর কোনো ধরনের যৌক্তিক আইনি দাবি বা মালিকানার প্রশ্ন থেকে থাকে, তবে তাদের উচিত ছিল দেশের প্রচলিত আইন এবং আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের দাবি প্রমাণ করার সুযোগ সবারই রয়েছে।

 

কিন্তু সেই আইনি পথে না হেঁটে, রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে বেআইনিভাবে পেশিশক্তির মহড়া দেখিয়ে এবং ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাকেন্দ্র ভেঙে ফেলার মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ অধিকার দেশের আইন কাউকে কখনোই দেয়নি।

 

এটি সরাসরি আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। এই জমিসংক্রান্ত জটিলতা স্থায়ীভাবে নিরসনে তিনি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং খুব দ্রুত একটি আইনগত সমাধানের আশা প্রকাশ করেন।

 

রাড্ডা মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং স্থানীয় জনজীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে মিরপুর এবং এর আশপাশের বিশাল জনবসতিপূর্ণ এলাকার অগুনতি শিশু, প্রসূতি মা এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাতৃকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে আসছে।

 

বিনামূল্যে বা অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই কেন্দ্রটি স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তাই কোনো স্বার্থান্বেষী চক্রের ঘৃণ্য অপতৎপরতার কারণে এই বিশাল এলাকার দরিদ্র মানুষ তাদের অতিপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে, তা বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না।

 

শিশুদের জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি, মাতৃকালীন স্বাস্থ্যসেবাসহ কেন্দ্রটির দৈনন্দিন সব ধরনের চিকিৎসাসেবা অতি দ্রুত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে। সেবাগ্রহীতা মা ও শিশুরা যেন তিল পরিমাণ ভোগান্তির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করে যাবে।

 

পরিশেষে বলা যায় যে, এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়, বরং এটি সমাজের দুর্বলতম অংশের ওপর এক ধরনের প্রত্যক্ষ নিপীড়ন। একটি আধুনিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো স্পর্শকাতর স্থানে এমন নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য অধিকারের মাপকাঠিতেও এটি একটি গুরুতর অপরাধ। সরকার এই স্পর্শকাতর বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমাজে এই কঠোর বার্তা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে যে, জনকল্যাণমূলক সেবাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক সুরক্ষায় রাষ্ট্র সর্বদা বদ্ধপরিকর। বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরপরই আইন অনুযায়ী পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হবে বলে প্রতিমন্ত্রী দেশবাসীকে চূড়ান্তভাবে আশ্বস্ত করেছেন।