তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দেশের রাজনীতিতে যদি নতুন করে জামায়াতে ইসলামীর মতো কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর অভাবনীয় উত্থান ঘটে, তবে তা সমগ্র জাতিকে এক ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক ধর্মযুদ্ধের দিকে পরিচালিত করতে পারে।
গত রোববার, সাতাশে সেপ্টেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এই বিস্ফোরক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন।
সদ্য সমাপ্ত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট, দাখিল এবং সমমানের সরকারি পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত মেধাবী ও কৃতী শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা প্রদানের লক্ষ্যে এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যা সাতটার দিকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দেশের চলমান রাজনীতি, অস্থিতিশীলতা তৈরির সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক যাত্রার নানাবিধ দিক নিয়ে বিস্তারিত ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জামায়াতে ইসলামীর দৃশ্যমান তৎপরতা ও প্রভাব বৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন মনোভাব ব্যক্ত করেন।
তিনি তাঁর বক্তব্যে জোরালোভাবে দাবি করেন যে, বাংলাদেশের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে জামায়াতের মতো চরমপন্থী আদর্শ লালনকারী কোনো রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রক্ষমতা কাঠামোর কাছাকাছি আসার সামান্যতম সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক উত্থান মানে কেবল একটি দলের ক্ষমতায় আরোহণ নয়, বরং এটি স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব, সামাজিক বুনন ও সার্বভৌমত্বকে এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ফেলে দেওয়ার সুস্পষ্ট পূর্বাভাস।
তিনি গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এ ধরনের রাজনৈতিক শক্তির মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা দেশকে একটি অনিবার্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত ধর্মযুদ্ধের দিকে ধাবিত করবে, যার চড়া মূল্য চোকাতে হবে সাধারণ মানুষকে।
এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের শিক্ষিত সমাজ, সচেতন তরুণ প্রজন্ম এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রতিটি নাগরিককে এখন থেকেই সর্বোচ্চ মাত্রায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের যেকোনো ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বা আস্ফালনের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের উদাত্ত আহ্বান জানান সরকারের এই তরুণ মন্ত্রী।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক, পটপরিবর্তন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সুবিধাবাদী চরিত্রের কঠোর সমালোচনা করতে গিয়ে নুরুল হক নূর জামায়াতে ইসলামীর অতীত ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক বিষয়ের অবতারণা করে বলেন, অতীতে যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল, তখন তাদের সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে বর্তমানের ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিল এই জামায়াতে ইসলামী।
আর আজ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ গ্রহণ করে সেই একই দলের মধ্যে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাভিলাষ তৈরি হয়েছে, যা দেশের জন্য অশনিসংকেত। এর পাশাপাশি তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্রের কথাও গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, সমাজের কিছু চিহ্নিত দুর্বৃত্ত, সদ্য ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির দোসর এবং তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি বিশেষ অংশ আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পতনের বিষয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
একদিকে পতিত স্বৈরাচারী গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রকাশ্যে সরকার পতনের হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কাতারে থাকা কিছু অংশও ঠিক একই ভাষায় কথা বলছে। এই দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর শক্তির একই সুরে কথা বলার পেছনে কোনো গোপন আঁতাত বা গভীর যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা রাষ্ট্রযন্ত্র ও সচেতন নাগরিকদের অত্যন্ত নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বর্তমান নবগঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের বৈধতা, স্থায়িত্ব এবং তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রাসঙ্গিকতা নিয়েও অত্যন্ত যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি গণমাধ্যমকে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক, অবিস্মরণীয় ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব সরকার দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বর্তমান সরকার দেশ পুনর্গঠন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং এখন পর্যন্ত এই সরকারের বয়স মাত্র সাড়ে ছয় মাসের মতো পার হয়েছে।
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর জন্য এই সংক্ষিপ্ত সময়টুকু অত্যন্ত নগণ্য। এমন একটি স্পর্শকাতর, রূপান্তরকালীন ও সংবেদনশীল সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী দীর্ঘ পদযাত্রা বা কঠোর সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে তা দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে বলে তিনি সতর্ক করে দেন।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে সুসংহত হওয়ার আগেই যদি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়, তবে সেই ঘোলা জলের সুযোগ নিয়ে পতিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী শক্তি পুনরায় দেশের রাজনীতিতে ফিরে আসার বা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে।
তাই যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি বা আন্দোলন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশের নবজাত গণতান্ত্রিক পরিবেশের স্থিতিশীলতা এবং আপামর জনসাধারণের বৃহত্তর স্বার্থকে সবার আগে বিবেচনায় রাখার জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তিনি অত্যন্ত বিনীত ও গঠনমূলক আহ্বান জানান।
জাতীয় ও বৃহৎ রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর পাশাপাশি সমসাময়িক সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে বহুল আলোচিত বিষয়গুলো নিয়েও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের অত্যন্ত সাবলীল ও খোলামেলা উত্তর দেন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রসঙ্গটি যখন সাংবাদিকরা তাঁর সামনে উত্থাপন করেন, তখন তিনি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে তার জবাব দেন।
তিনি এই দুর্ভাগ্যজনক ও অনভিপ্রেত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্পষ্টভাবে বলেন যে, চিকিৎসাকেন্দ্রের দুর্ঘটনার পেছনে যাদের সামান্যতম অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো অধিকার কারও নেই এবং সরকার এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে। এছাড়া, দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল আলোচিত ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান বিতর্কের বিষয়েও তিনি নিজের সুস্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করেন।
তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সালমান মুক্তাদির দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে একজন অত্যন্ত সুপরিচিত মুখ। সাম্প্রতিক সময়ে নির্দিষ্ট একটি ইস্যুতে তাঁর প্রতি দেশের সাধারণ মানুষ ও নেটিজেনদের যে অভূতপূর্ব সংহতি এবং গভীর সমবেদনা পরিলক্ষিত হয়েছে, তা ইতোমধ্যে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের নজরে এসেছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
তরুণ প্রজন্মের আবেগ, অনুভূতি ও মতামতের প্রতি বর্তমান সরকার যে সর্বদা শ্রদ্ধাশীল ও মনোযোগী, প্রতিমন্ত্রীর এই মন্তব্য তারই একটি পরোক্ষ ও ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
পটুয়াখালীর শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এই জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দারুণ অনুপ্রেরণাদায়ক।
অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আগত শত শত মেধাবী শিক্ষার্থী, তাদের গর্বিত অভিভাবক, শিক্ষকমণ্ডলী এবং স্থানীয় সুশীল সমাজের বিশিষ্ট প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া, প্রতিমন্ত্রীর নিজস্ব রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদ এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের জেলা, উপজেলা এবং তৃণমূল পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী এই অনুষ্ঠানে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একটি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার এক নিপুণ ও স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরে নুরুল হক নূর প্রমাণ করেছেন যে, বর্তমান সরকার কেবল প্রথাগত রাষ্ট্র পরিচালনায়ই নয়, বরং তরুণদের মনস্তত্ত্ব বোঝা এবং দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়েও সম্যকভাবে সচেতন।
তাঁর এই সময়োপযোগী, সাহসী ও বলিষ্ঠ বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাবে এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল জোরালোভাবে বিশ্বাস করেন।