মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিজস্ব প্রয়োজনেই বোয়িং কিনেছে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:২১ পিএম

নিজস্ব প্রয়োজনেই বোয়িং কিনেছে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
ছবি : Collected

রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’-এর বহর সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক রুটের পরিধি বৃদ্ধি এবং নতুন উড়োজাহাজ ক্রয় সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরকারের অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

 

সাম্প্রতিক সময়ে বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়ের বিষয়ে বাইরের কোনো পরাশক্তির অযাচিত চাপের গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় জানিয়েছেন যে, কেবল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক যাত্রীদের বিপুল চাহিদা মেটানো এবং বিমানকে লাভজনক ও বিশ্বমানের পরিবহন সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেই এই উড়োজাহাজগুলো ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার।

 

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক কার্যক্রম, দূরপাল্লার রুট সম্প্রসারণ এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সরকারি নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর পেশাদারিত্বের নিরিখে এই ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার দেশের এভিয়েশন খাতকে একুশ শতকের প্রতিযোগিতামূলক বাজারের উপযোগী করে সাজাতে বদ্ধপরিকর।

 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের তথ্যবহুল জবাব দিতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বোয়িং ক্রয়ের স্বচ্ছতা ও কৌশলগত দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কেনার এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত উন্মুক্ত, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন মেনেই সম্পন্ন হয়েছে।

 

এই তাৎপর্যপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বাংলাদেশ সরকারের চারজন শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত ছিলেন, যা এই চুক্তির সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্বচ্ছতা ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বোঝাপড়ার অনন্য প্রমাণ।

 

প্রতিমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, আমরা বাইরের কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপে নতিস্বীকার করে উড়োজাহাজ কিনিনি; বরং জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার নিজস্ব রুটিন চাহিদা ও কারিগরি প্রয়োজনীয়তা যাচাই-বাছাই করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এই বোয়িংগুলো কেনা হয়েছে।

 

তিনি আরও যোগ করেন যে, ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ দীর্ঘ পাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে বোয়িং কোম্পানির নির্ভরযোগ্য উড়োজাহাজ ব্যবহার করে আসছে এবং সেই আস্থার জায়গা থেকেই নতুন করে বোয়িংকে বেছে নেওয়া হয়েছে।

 

তবে আধুনিক বিমান পরিবহন শিল্পে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মিশ্র বহরের যে একান্ত প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সে কথাও তিনি স্বীকার করেন। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক রুটের পরিধি বাড়ানো এবং বাংলাদেশকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব বা বিমান চলাচলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মিশ্র উড়োজাহাজ বহরের বিকল্প নেই বলে মনে করেন হুমায়ুন কবির।

 

যৌক্তিক ও কারিগরি ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের প্রতিটি সফল এয়ারলাইন্স তাদের গন্তব্যের দূরত্ব, যাত্রীর চাপ এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন কোম্পানির উড়োজাহাজের সমন্বয়ে একটি মিশ্র বহর পরিচালনা করে।

 

সেই মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশের প্রাপ্ত উড়োজাহাজের বহরকে আরও সম্প্রসারিত ও আধুনিকীকরণ করা এখন সময়ের দাবি। এই বিশাল ক্রয় প্রক্রিয়ার পেছনে সরকারের কোনো লুকায়িত অ্যাজেন্ডা নেই বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।

 

সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয়তার নিখুঁত হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতেই গ্রহণ করা হয়েছে এবং শুরু থেকেই পুরো প্রক্রিয়াটি গণমাধ্যমের সামনে খোলামেলাভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

যাত্রীসেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা এবং দক্ষিণ এশিয়ার একটি বৈশ্বিক এভিয়েশন হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য উড়োজাহাজের বহর সম্প্রসারণ অপরিহার্য। প্রতিমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থে ও যাত্রীচাহিদা পূরণে যদি ভবিষ্যতে আরও বোয়িং বা অন্য উড়োজাহাজ কেনার প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে সরকার নিঃসন্দেহে তা ক্রয় করবে।

 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-নিউ ইয়র্ক রুটে সরাসরি দূরপাল্লার ফ্লাইট পুনরায় চালু করার বিষয়ে দীর্ঘদিনের যে বিপুল জনদাবি রয়েছে, সে বিষয়েও সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

 

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা উত্তর আমেরিকার এই রুটটি পুনরায় চালুর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান যে, বর্তমানে এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি মূল্যায়ন বা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

 

অতীতে বিভিন্ন কারিগরি সমস্যা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থার কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড সংক্রান্ত জটিলতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কড়া শর্তাবলি পূরণে ব্যর্থতার কারণেই ঢাকা-নিউ ইয়র্ক রুটের ফ্লাইট স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

 

বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সেই ত্রুটিগুলো সংশোধন করে রুটটি পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি, নিরাপত্তা ও আইনি বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। বহু কাঙ্ক্ষিত রুটটি পুনরায় চালু হলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেমন সরাসরি মাতৃভূমির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন, ঠিক তেমনি জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার রাজস্ব আয়েও বিশাল ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

 

আর এই দীর্ঘ পাল্লার সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার জন্যই বোয়িংয়ের মতো অত্যাধুনিক ও সুপরিসর উড়োজাহাজের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনের রাজনৈতিক অংশে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতার করা তীব্র সমালোচনার কড়া ও যুক্তিনির্ভর জবাব দেন।

 

বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ভাষণ নিয়ে বিরোধী দলের নেতার তোলা মনগড়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি চরম বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেন। ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মতো একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কের জাতিসংঘে দেওয়া একটি সময়োপযোগী ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ নিয়ে বিরোধী দলের ওই জ্যেষ্ঠ নেতা কী চিন্তা করে এমন ভিত্তিহীন সমালোচনা করেছেন, তা সত্যিই বোধগম্য নয়।

 

প্রতিমন্ত্রী অকাট্য যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ভাষণের মূল উপজীব্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর ফলে বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর আসন্ন অস্তিত্বের সংকট।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একটি ভয়াবহ বৈশ্বিক দুর্যোগ এবং জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম কি কেবল বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর মতো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নিজস্ব দলীয় বিষয় হতে পারে, নাকি এটি সমগ্র জাতি এবং সারা বিশ্বের মানবকুলের জন্যই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল জীবন-মরণ সমস্যা?

 

এই প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের অবতারণা করে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের কাছে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এবং উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দাবি করা কোনোভাবেই দেশের অভ্যন্তরীণ দলীয় রাজনীতি হতে পারে না।

 

প্রধানমন্ত্রীর সেই আন্তর্জাতিক ভাষণের ঠিক কোন অংশে সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির কথা বলা হয়েছে, তা তিনি নিজে শত চেষ্টা করেও খুঁজে পাননি বলে গণমাধ্যমের সামনে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

 

বিরোধী দলের নেতাদের প্রতি প্রচ্ছন্ন উপদেশ দিয়ে তিনি বলেন, একটি আন্তর্জাতিক ভাষণের প্রকৃত প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক তাৎপর্য না বুঝে এবং সম্পূর্ণ বক্তৃতাটি ভালোভাবে শ্রবণ না করেই গণমাধ্যমে সস্তা রাজনৈতিক মন্তব্য করা কোনোভাবেই সুস্থ রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না।

 

দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাদের উচিত আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে আরও বেশি পড়ালেখা করা এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে কথা বলার সময় অত্যন্ত সতর্কতা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দেওয়া।

 

পরিশেষে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলনটি কেবল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের প্রতিচ্ছবিই তুলে ধরেনি, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের বলিষ্ঠ অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম দায়িত্বশীলতার এক কড়া বার্তাও প্রদান করেছে।