বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ আলোচনা চলমান, জানাল কাতার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:৩০ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ আলোচনা চলমান, জানাল কাতার
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চলমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া ইরান পরিস্থিতির একটি নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ মোড় উন্মোচিত হয়েছে। দীর্ঘ সাত মাস ধরে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যে বহুমুখী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান রয়েছে, তার দৃশ্যমান কোনো সমাধান না মিললেও পর্দার আড়ালে এক অবিরাম কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর উদ্বেগের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র কাতার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে, যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে বিবদমান দুই প্রধান প্রতিপক্ষ-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয় এবং পরোক্ষ আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে।

 

দৃশ্যত সংঘাতের ময়দানে একধরনের স্থবিরতা ও অচলাবস্থা বিরাজ করলেও, কূটনৈতিক পর্যায়ে এই নীরব যোগাযোগ একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তির ক্ষীণ আশা জাগিয়ে রেখেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সাত মাস ধরে চলা এই তীব্র সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।

 

একদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত সামরিক চাপ, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত বিপর্যয়-সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চলে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সংঘাতের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যত যখন মনে হচ্ছে শান্তির পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি একটি দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতায় রূপ নিয়েছে, ঠিক তখনই কাতারের এই ইতিবাচক বার্তা বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইব্রাহিম আল-হাশমি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যে সংলাপ প্রক্রিয়া কখনোই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়নি।

 

ইব্রাহিম আল-হাশমি তার বক্তব্যে গভীরভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কাতার এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সক্রিয় সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে নিয়মিতভাবে বার্তা আদান-প্রদান চালু রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন দুটি চরম বৈরী রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক বা আলোচনার সুযোগ থাকে না, তখন তৃতীয় কোনো নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের মাধ্যমে এই ধরনের পরোক্ষ আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

 

কাতার ঐতিহাসিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জটিল ও স্পর্শকাতর সংঘাতে সফল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমান এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতেও দোহা তার সেই ঐতিহ্যবাহী নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে একটি বিশ্বস্ত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে, যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি থেকে সংঘাত আরও বৃহত্তর ও নিয়ন্ত্রণের বাইরের কোনো যুদ্ধে রূপ না নেয়।

 

তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ার পথে একটি বড় এবং জটিল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামোর চরম অস্পষ্টতা। দীর্ঘ সাত মাসের এই নিরবচ্ছিন্ন ও তীব্র যুদ্ধে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে যে ব্যাপক ও অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়।

 

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও বেশি রহস্যময় ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মুখোমুখি হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের চলমান পরিস্থিতি এবং নেতৃত্বহীনতার বিষয়ে অত্যন্ত খোলামেলা এবং বিস্ময়কর কিছু মন্তব্য করেছেন, যা এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘তাদের প্রথম সারির নেতারা চলে গেছেন, দ্বিতীয় সারির নেতারাও নেই। আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দেশটি এখন কে পরিচালনা করছে তা কেউ জানে না।’

 

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই একটিমাত্র মন্তব্য থেকেই অনুধাবন করা যায় যে, ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্ব এই দীর্ঘ যুদ্ধে কতটা ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত এবং ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছে। ওয়াশিংটনের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় কৌশলগত এবং কূটনৈতিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে তেহরানের প্রকৃত ক্ষমতাধর ব্যক্তির অনুপস্থিতি বা অজ্ঞাত অবস্থান।

 

যখন একটি রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত থাকে এবং তার সর্বোচ্চ ও দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন কার সাথে বা কোন কর্তৃপক্ষের সাথে শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা হবে, সেটি এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি নতুন এবং গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একটি দেশের সামরিক শীর্ষ নেতৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো দেশটিতে একটি চরম ক্ষমতা শূন্যতা সৃষ্টি হওয়া।

 

সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রথম ও দ্বিতীয় সারির নেতাদের অবর্তমানে ইরানের সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে এর অত্যন্ত প্রভাবশালী শাখাগুলো বর্তমানে একধরনের বিকেন্দ্রীভূত বা নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় থাকতে পারে।

 

এ ধরনের পরিস্থিতি যেকোনো শান্তি আলোচনার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। কারণ, কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়ও, তবে সেই সমঝোতা বা চুক্তি ইরানের অভ্যন্তরে থাকা অবশিষ্ট গোষ্ঠীগুলো বা খণ্ডিত নেতৃত্ব মেনে নেবে কি না, তার কোনো সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই।

 

ওয়াশিংটন প্রশাসন এই মুহূর্তে ঠিক এই জায়গাটিতেই সবচেয়ে বড় দ্বিধায় ভুগছে। তারা বুঝতে পারছে না যে, পরোক্ষভাবে যাদের সাথে আলোচনা চলছে, তাদের পুরো দেশের সামরিক কাঠামোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কি না।

 

এই পুরো সংঘাতের সমীকরণে ইসরায়েলের ভূমিকাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানের ফলেই মূলত ইরানের এই শীর্ষ নেতৃত্ব আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। গত সাত মাস ধরে চলা এই সংঘাতে ইসরায়েল তার নিজস্ব নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিশ্চিত করার জন্য কোনো ধরনের আপস করতে রাজি হয়নি।

 

তবে সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের পর এখন উভয় দেশই একটি সম্মানজনক এবং নিজেদের স্বার্থ অনুকূলে থাকা একটি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে।

 

কিন্তু প্রতিপক্ষ শিবিরে একটি সুনির্দিষ্ট ও একক নেতৃত্বের অভাব সেই সমাধানকে বারবার প্রলম্বিত করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই যুদ্ধের একটি যৌক্তিক সমাপ্তি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত গভীরভাবে অনুধাবন করছে যে, যুদ্ধ যদি আরও প্রলম্বিত হয়, তবে তা কেবল ওই অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনীতির জন্যও এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

 

কাতার এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো এই বিষয়টি উপলব্ধি করেই পর্দার আড়ালে তাদের জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা চেষ্টা করছে ইরানের অভ্যন্তরে বর্তমানে যারা এই অন্তর্বর্তীকালীন বা খণ্ডিত ক্ষমতা ধারণ করে আছেন, তাদের সাথে একটি গঠনমূলক সংযোগ স্থাপন করতে, যাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই যুদ্ধবিরতির রূপরেখা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়।

 

সংঘাতের ময়দানে যখন অস্ত্রের ঝনঝনানি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন কূটনীতির এই সূক্ষ্ম মাধ্যমগুলোই একমাত্র আশার আলো হয়ে কাজ করে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সাত মাসের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রকে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের দিকে নিয়ে গেছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথায় ইরানের যে নেতৃত্বহীন ও বিপর্যস্ত অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে, তা যেমন ওয়াশিংটনের জন্য এক কৌশলগত অস্বস্তির কারণ, তেমনি তা সমগ্র বিশ্বের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয়। নেতৃত্ববিহীন একটি রাষ্ট্র যেকোনো মুহূর্তে আরও বেশি চরমপন্থী বা অসংলগ্ন আচরণ করতে পারে।

 

ঠিক এই চরম সংবেদনশীল ও অস্থিতিশীল মুহূর্তেই কাতারের মতো একটি নির্ভরযোগ্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বিশ্ব শান্তির জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয় হলো, পরোক্ষ এই বার্তা আদান-প্রদান এবং কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে চলমান এই দীর্ঘ স্থবিরতা ভেঙে একটি প্রকৃত শান্তির চুক্তি বয়ে আনতে সক্ষম হয় কি না, নাকি চরম নেতৃত্ব সংকটের কারণে এই আলোচনা কেবলই একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অন্তহীন প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। পুরো বিশ্ব এখন অত্যন্ত আগ্রহ ও উৎকণ্ঠার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল কূটনৈতিক চালচিত্রের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

 

- মিডল ইস্ট আই