মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী আটলান্টার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ওয়াশিংটনের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের টেবিলে এখন তেহরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন ও আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপের রূপরেখা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে ওয়াশিংটনের এমন আগ্রাসী মনোভাব ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সাময়িকীটির তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এই জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে ইরানের বিরুদ্ধে একটি দৃশ্যমান ও কঠোর সামরিক আঘাত হানার পরিকল্পনা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরকে তিনি ইতিমধ্যে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তারা ইরানের ঠিক কোন কোন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় এবং ঠিক কীভাবে হামলা চালানো যেতে পারে, তার একটি বিস্তারিত এবং কার্যকরী রণকৌশল প্রণয়ন করে তাঁর টেবিলে উপস্থাপন করে।
যদিও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন ছিল যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের সংবেদনশীল সময় পার না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের কোনো নতুন সামরিক সংঘাতে জড়াবে না, তবে প্রেসিডেন্টের এই আকস্মিক নির্দেশ সেই ধারণা ও জল্পনাকল্পনাকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে।
পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ কমান্ড ‘সেন্টকম’ বর্তমানে সম্ভাব্য এই হামলার যাবতীয় খুঁটিনাটি ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের কাজ সার্বক্ষণিকভাবে পরিচালনা করছে।
কৌশলগত ড্রোন, দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমানের সমন্বয়ে কীভাবে এই অভিযান পরিচালিত হতে পারে, তার কারিগরি মূল্যায়ন চলছে অত্যন্ত গোপনে। তবে সামগ্রিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত এই আক্রমণের চূড়ান্ত নির্দেশ দেবেন কি না, তা নিয়ে তাঁর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে এখনো ব্যাপক বিতর্ক ও বিচার-বিশ্লেষণ চলছে।
নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। আটলান্টার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ময়দানে নিজেদের একক সাফল্য ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে পেট্রোলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সামাল দেওয়াই হচ্ছে এই সম্ভাব্য অভিযানের অন্যতম মূল বিবেচনা।
প্রেসিডেন্টের বলয়ের মধ্যে যাঁরা নির্বাচনের আগেই ইরানে সরাসরি আঘাত হানার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন, তাঁদের যুক্তি হলো এই ধরনের একটি সফল ও সীমিত অভিযান পরিচালিত হলে মার্কিন নাগরিকদের সামনে বর্তমান প্রশাসনের সামরিক পরাক্রম ও জাতীয় সুরক্ষার সাফল্যকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
এর মাধ্যমে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগকে চাঙ্গা করে নির্বাচনে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা সহজ হবে বলে তাঁরা বিশ্বাস করেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে মূলত দুটি ভিন্নমুখী সময়সীমা ও মাত্রার পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছে।
একটি পরিকল্পনা অনুযায়ী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই তাৎক্ষণিক আঘাত হানা হতে পারে, অথবা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনের ঠিক পরপরই অভিযানটি শুরু করা হতে পারে। এই আক্রমণ সীমিত আকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হতে পারে, আবার তা বিস্তৃত পরিসরের সামরিক অভিযানেও রূপ নিতে পারে।
সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি শোধনাগার, তেল রফতানিকারক বন্দর এবং কৌশলগত শক্তি অবকাঠামোগুলোকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। ওয়াশিংটনের একাংশের ধারণা, ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারলে তেহরানকে স্থায়ীভাবে কোণঠাসা করা সম্ভব হবে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টা পরিষদের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই মুহূর্তে এমন বিপজ্জনক ঝুঁকি নেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনোভাবেই নতুন করে এমন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করা উচিত হবে না যার পরিণতি সম্পর্কে ওয়াশিংটন নিশ্চিত নয়।
এই বিরুদ্ধবাদী উপদেষ্টারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে নিয়োজিত সাধারণ মার্কিন সেনারা সরাসরি পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
সংঘাত চলাকালে যদি কোনো মার্কিন সেনার প্রাণহানি ঘটে, তবে তা মার্কিন জনমতকে বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে পুরোপুরি ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে। ফলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির জন্য তা একটি বিশাল রাজনৈতিক বিপর্যয় বয়ে নিয়ে আসার মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এমন পদক্ষেপকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পারস্য উপসাগর ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাসোলিন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতিকে সরাসরি বাড়িয়ে দেবে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে সাধারণ ভোটারদের জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি পেলে তা ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা ও ব্যালট বাক্সে চূড়ান্তভাবে নেতিবাচক আঘাত হানবে।
এই কারণে অনেক অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তা মনে করছেন, সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এই মুহূর্তে বেশি জরুরি। আন্তর্জাতিক জোট ও আঞ্চলিক সমর্থনের ক্ষেত্রে সাময়িকীটি এক বিশেষ দিক উন্মোচন করেছে।
আটলান্টার প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত ইরানে এই সামরিক অভিযান শুরু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে তাদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল সরাসরি এই হামলায় শরিক হবে।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যৌথভাবে আকাশপথে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস এবং সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার সমন্বয় করবে। ইসরায়েলের এই সরাসরি অন্তর্ভুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে দ্বিপাক্ষিক বিরোধ থেকে একটি সামগ্রিক আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে রূপ দেওয়ার পথ উন্মুক্ত করবে বলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
ইরানের পক্ষ থেকেও একাধিকবার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, তাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা কৌশলগত সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো আঘাতের জবাব দেওয়া হবে চরম কঠোরতার সঙ্গে। তেহরান যদি এই হামলার জবাবে আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো কিংবা ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে পাল্টা আঘাত হানে, তবে তা এক দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞের সূত্রপাত করবে।
ফলে সার্বিক পরিস্থিতি এখন হোয়াইট হাউসের চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার তাড়না নাকি একটি অনিয়ন্ত্রিত আঞ্চলিক যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতির ভয়-কোন বিষয়টি মার্কিন নেতৃত্বকে পরিচালিত করবে, বিশ্বজুড়ে কূটনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষ এখন অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে সেই উত্তরের অপেক্ষা করছেন।