শুক্রবার, অক্টোবর ৯, ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিসংখ্যান গোপন করছে যুক্তরাষ্ট্র, পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিসংখ্যান গোপন করছে যুক্তরাষ্ট্র, পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের আবহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর বা সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রকৃত সামরিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সুকৌশলে গোপন করছে বলে তিনি সরাসরি অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।

 

এই তথ্য গোপনের তীব্র সমালোচনা করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে, সাধারণ মানুষকে চিরকাল ধোঁকা দিয়ে বা প্রতারণার জালে আটকে রাখা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এবং বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে তার এই মন্তব্য ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা মার্কিন সামরিক বাহিনীর স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

বিগত কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইরানের সমর্থনপুষ্ট বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে থেমে থেমে যে তীব্র সংঘাত চলছে, তার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বরাবরই পাল্টাপাল্টি দাবি করে আসছে উভয় পক্ষ।

 

যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত তাদের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং জনসমক্ষে তা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক বিধিনিষেধ ও সেন্সরশিপ আরোপ করে থাকে।

 

অপরদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র এবং আকাশযানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে, যা মার্কিন প্রশাসন সচেতনভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে।

 

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই বিষয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। তার এই বিবৃতি এমন এক সময়ে জনসমক্ষে এল, যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনে এবং প্রখ্যাত ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির সূত্র ধরে জানানো হয়েছে যে, আব্বাস আরাগচি তার বার্তায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যেই এই ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ লুকিয়ে আছে।

 

তিনি উল্লেখ করেন, গত মে মাসে মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা পরিষদ বা কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস) আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রতিবেদনে স্বীকার করে নিয়েছিল যে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী হামলায় অন্তত ৪২টি মার্কিন সামরিক বিমান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, সময়ের সাথে সাথে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ না কমে বরং আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সেই মার্কিন সামরিক যানের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৮১টিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে বলে আরাগচি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছেন।

 

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা এই প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বহুগুণ বেশি, যা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না। এই বিপুল মাত্রার সামরিক ক্ষয়ক্ষতির অকাট্য প্রমাণ হিসেবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত যৌক্তিক একটি প্রশ্ন তুলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো যদি সত্যিই সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে এবং সেখানে যদি কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা বিপর্যয় না হয়ে থাকে, তবে কেন মার্কিন কর্তৃপক্ষ সেগুলো স্বাধীনভাবে পরিদর্শনের অনুমতি দিচ্ছে না?

 

তিনি অভিযোগ করেন, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এমনকি তাদের নিজেদের দেশের জনপ্রতিনিধি অর্থাৎ মার্কিন কংগ্রেসের একজন দায়িত্বশীল সিনেটরকেও সেই সামরিক ঘাঁটিগুলো সশরীরে পরিদর্শন এবং সেখানকার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করার ন্যূনতম অনুমতি প্রদান করছে না।

 

মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে দাবি করে আসছে যে তাদের ঘাঁটিগুলোর অবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক, কিন্তু খোদ মার্কিন আইনপ্রণেতাদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করার এই নজিরবিহীন ঘটনা সেন্টকমের সেই দাবির সত্যতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

 

আব্বাস আরাগচির মতে, সামরিক ঘাঁটিগুলোর প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং ময়দানের বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই এ ধরনের কঠোর ও অস্বাভাবিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

 

সামরিক স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার এই চরম অভাবের দিকে ইঙ্গিত করেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সবচেয়ে জোরালো বার্তাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দিয়েছেন। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের যুগে যেকোনো সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতি দীর্ঘকাল গোপন রাখা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ।

 

উন্নত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং উন্মুক্ত তথ্য প্রবাহের কারণে রণাঙ্গনের প্রকৃত চিত্র একসময় জনসমক্ষে আসতে বাধ্য। আরাগচির এই প্রকাশ্য অভিযোগ মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোকে উন্মোচন করার একটি সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওই পোস্টের একেবারে শেষাংশে আব্বাস আরাগচি মার্কিন প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত কঠোর ও প্রত্যয়ী কণ্ঠে জোর দিয়ে বলেন যে, এই সংবেদনশীল বিষয়ে সাধারণ মানুষকে চিরকাল ধোঁয়াশা বা প্রতারণার মাঝে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

 

তার এই বক্তব্য কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক পাল্টা আক্রমণ নয়, বরং এটি তথ্যযুদ্ধ এবং মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ময়দানে ইরানের একটি শক্তিশালী অবস্থান জানান দিচ্ছে। যখন খোদ মার্কিন সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যের সাথে সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক দাবির অমিল পরিলক্ষিত হয়, তখন তা কেবল সামরিক বাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং সাধারণ মার্কিন করদাতা ও বৈশ্বিক মিত্রদের মনেও গভীর সন্দেহের বীজ বপন করে।

 

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত সুকৌশলে এই সন্দেহের জায়গাটিকেই বৈশ্বিক ফোরামে তুলে ধরেছেন। সামরিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এত অল্প সময়ের ব্যবধানে একক কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে এই বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক সামরিক আকাশযানের ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বিরল ও উদ্বেগজনক ঘটনা।

 

বিপুল অঙ্কের এই আর্থিক ও কাঠামোগত ক্ষতি কেবল মার্কিন কোষাগারেই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং তা মার্কিন সাধারণ করদাতাদের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কৌশল নিয়েও দেশটির অভ্যন্তরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি একেকটি সামরিক ড্রোন এবং যুদ্ধবিমানের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ, সময় ও মেধা বিনিয়োগ করা হয়, তা যখন বিরোধী পক্ষের প্রতিরোধমূলক হামলায় অনায়াসে অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন তা বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও অজেয় ভাবমূর্তিতেও একটি বড় ধরনের আঘাত হানে।

 

পরিশেষে বলা যায়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির এই সুদৃঢ়, যৌক্তিক এবং তথ্যভিত্তিক সমালোচনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে একটি নতুন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে। এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, আধুনিক যুগের যুদ্ধ কেবল রণাঙ্গনের সম্মুখ সমরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ময়দানেও বিবদমান পক্ষগুলো সমানে একে অপরের মোকাবেলা করছে।

 

মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান এবং তা সুকৌশলে গোপন করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থ চেষ্টা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে যে, আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগে কোনো পরাশক্তিই আর এককভাবে অপরাজেয় নয় এবং তথ্যের নিয়ন্ত্রণও এখন আর একক কোনো বলয়ের হাতে সীমাবদ্ধ নেই।

 

আগামী দিনগুলোতে এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কোন দিকে মোড় নেয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক কৌশল, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয় কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সমগ্র বিশ্ব প্রবল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে।

 

- বিবিসি বাংলা