তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন যে, দেশের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা এবং আপামর জনতার অটুট ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান যেকোনো ধরনের আগ্রাসী অর্থনৈতিক যুদ্ধকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে পুরোপুরি সক্ষম।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে দেওয়া এক বিশেষ ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় তিনি এই অবিচল আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যখন পরাশক্তিগুলো সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অবরোধ ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞাকে অন্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে অবদমিত করার একটি প্রধান এবং নিষ্ঠুর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, ঠিক সেই সময়ে ইরানের শীর্ষ রাষ্ট্রনেতার এই মন্তব্য বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নতুন, স্পষ্ট এবং শক্তিশালী বার্তা বহন করছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁর এই দূরদর্শী বক্তব্যে আধুনিক বিশ্বের সংঘাত ও যুদ্ধবিগ্রহের পরিবর্তিত রূপরেখা অত্যন্ত নিখুঁত, বাস্তবসম্মত এবং তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, প্রচলিত সামরিক যুদ্ধ মানুষের কাছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান; এর ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, আগ্নেয়াস্ত্রের নির্মম ব্যবহার, অবকাঠামোগত বিনাশ এবং মানুষের সরাসরি শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি খুব সহজেই খোলা চোখে দেখা যায়।
কিন্তু একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক যুদ্ধ সম্পূর্ণ অদৃশ্য একটি বিষয়, অথচ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব একটি সামরিক সংঘাতের চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ, সুদূরপ্রসারী এবং একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য চরম ধ্বংসাত্মক।
যখন কোনো একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম দেশের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা পরাশক্তিগুলো চারদিক থেকে অন্যায্য অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দেয়, তখন সেই দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষা খাত এবং বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারগুলো নীরবে এবং ধীরে ধীরে চরমভাবে বিপর্যস্ত হতে থাকে।
এটি হলো এমন এক নীরব ঘাতক, যা কোনো ধরনের দৃশ্যমান গোলাগুলি বা রক্তপাত ছাড়াই একটি উদীয়মান জাতির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দেওয়ার হীন অপচেষ্টা করে। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই অদৃশ্য যুদ্ধ যত কঠিন, কষ্টকর এবং ভারীই হোক না কেন, ইরান তার সমগ্র রাষ্ট্রীয় শক্তি দিয়ে তা মোকাবিলা করতে মানসিকভাবে এবং কাঠামোগতভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের সমমনা মিত্র দেশগুলো ইরানের ওপর একের পর এক অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। এই নিরবচ্ছিন্ন ও একতরফা আন্তর্জাতিক চাপের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইরানের বিকাশমান অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে স্থবির করে দেওয়া এবং বর্তমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরানো।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁর দীর্ঘ আলোচনায় ঠিক এই সংবেদনশীল প্রসঙ্গের দিকেই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, শত্রুরা রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করতে এবং দেশের সাধারণ জনগণকে সরকারি সেবা প্রদানের যে সক্ষমতা রয়েছে তা নস্যাৎ করে দিতে যত ধরনের অন্যায্য চাপ ও অমানবিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব, তার প্রতিটি কৌশলই তারা প্রয়োগ করেছে।
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ইরানকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতে বেআইনি বাধা প্রদান এবং দেশের মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও খাদ্য আমদানিতে পরিকল্পিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মাধ্যমে তারা মূলত ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার সর্বোচ্চ অপচেষ্টা চালিয়েছে।
কিন্তু এতসব ভয়াবহ বৈরী পরিস্থিতি এবং প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইরানের বর্তমান সরকার তাদের পূর্ণ সক্ষমতা, সততা, দেশপ্রেম এবং নিষ্ঠার সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে এবং তাদের প্রাত্যহিক জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও বদ্ধপরিকর।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি চিরন্তন সত্য হলো, একটি রাষ্ট্রের চরম সংকটকালীন মুহূর্তে এবং অস্তিত্ব রক্ষার যেকোনো সংগ্রামে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সেই দেশের সাধারণ দেশপ্রেমিক জনগণ। ইরানের প্রেসিডেন্ট তাঁর এই আবেগময় বক্তব্যে ঠিক এই অমোঘ সত্যটিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বিশ্ববাসীর সামনে ঘোষণা করেন যে, যতদিন পর্যন্ত দেশের আপামর জনসাধারণ বর্তমান সরকারের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস বজায় রাখছে, ততদিন কোনো দৃশ্যমান বা অদৃশ্য বিপদ, এমনকি বিশ্বের যেকোনো শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী শত্রুকেই তারা বিন্দুমাত্র ভয় করেন না।
সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, অপরিসীম ধৈর্য এবং নিঃস্বার্থ সমর্থনই হলো দীর্ঘমেয়াদে ইরানের টিকে থাকার এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মূল চালিকাশক্তি। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, শত্রুদের চাপিয়ে দেওয়া এই অর্থনৈতিক যুদ্ধ কেবল সরকারের একার কোনো যুদ্ধ নয়; এটি সমগ্র ইরানি জাতির অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা এবং স্বকীয়তা রক্ষার এক ঐতিহাসিক লড়াই।
আর এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে চূড়ান্তভাবে জয়লাভ করার জন্য ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা এবং অপরিসীম আত্মত্যাগের কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের এই অনমনীয় ও সাহসী মনোভাব মূলত ইরানের দীর্ঘদিনের চর্চিত প্রতিরোধ অর্থনীতি বা আত্মনির্ভরশীল অর্থনৈতিক কাঠামোরই একটি অত্যন্ত সফল ও বাস্তবসম্মত প্রতিফলন।
বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ক্রমাগত একতরফা চাপের মুখে পড়ে ইরান গত কয়েক দশক ধরে নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি, নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ও সুপরিকল্পিত ব্যবহার এবং বাইরের পশ্চিমা বিশ্বের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার এক অত্যন্ত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশল গ্রহণ করেছে।
মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত সেই আত্মনির্ভরশীলতার রাষ্ট্রীয় নীতিরই এক জোরালো ও আনুষ্ঠানিক পুনরুক্তি। তিনি এমন এক জটিল ও সংকটাপন্ন সময়ে এই সাহসী বার্তা প্রদান করলেন, যখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নানামুখী সামরিক সংঘাতের দাবানল জ্বলছে এবং ইরানকে চারদিক থেকে কোণঠাসা করার জন্য বহুমুখী ও সুপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক কূটনীতি পর্দার আড়ালে চরমভাবে সক্রিয় রয়েছে।
এমন এক টালমাটাল ও অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তাঁর এই শান্ত, পরিপক্ব অথচ অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, ইরান কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক জবরদস্তি বা অন্যায় আধিপত্যবাদের কাছে নিজেদের মাথা নত করবে না।
এর পাশাপাশি, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে চলমান নানামুখী যুদ্ধের বিভিন্ন দিকের প্রতি একই সঙ্গে অত্যন্ত সতর্ক ও তীক্ষ্ণ নজর রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপরও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান তাঁর আলোচনায় সর্বোচ্চ মাত্রায় জোর দিয়েছেন।
তিনি দেশের সামরিক বাহিনী, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান সময়ে শত্রুরা কেবল একটি নির্দিষ্ট ফ্রন্টে বা দৃশ্যমান ময়দানে আক্রমণ পরিচালনা করছে না; বরং তারা সামরিক উসকানি, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, কূটনৈতিক মিথ্যাচার এবং ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবরোধ-সব দিক থেকেই একযোগে ইরানের ওপর আঘাত হানার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তাই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ নাগরিক-সবাইকে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত সচেতন, ধৈর্যশীল ও দূরদর্শী হতে হবে। কেবল শক্তিশালী সামরিক প্রস্তুতি বা অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র দিয়ে আধুনিক যুগের এই বহুমাত্রিক ও জটিল আগ্রাসন কোনোভাবেই প্রতিহত করা সম্ভব নয়।
এর জন্য সামরিক শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামো, সমাজের সর্বস্তরে সুষম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন ব্যবস্থা।
বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের এই প্রতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকে সমানভাবে ও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মনোনিবেশ করেছে এবং যেকোনো মূল্যে সর্বাত্মকভাবে দেশের সাধারণ জনগণের সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে এবং তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানে সম্পূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।
পরিশেষে অত্যন্ত সুনিশ্চিতভাবে বলা যায়, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই অত্যন্ত সময়োপযোগী, যৌক্তিক এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর বক্তব্য সমগ্র ইরানি জাতির জন্য এক বিশাল ও অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং তাঁর দেশের আপামর জনতাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, শত্রুর দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত ও অমানবিক অর্থনৈতিক যুদ্ধকে তারা কেবল নিষ্ক্রিয় বা প্রতিহতই করবেন না, বরং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত দেশপ্রেম ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে অদূর ভবিষ্যতে এই অদৃশ্য যুদ্ধকে চূড়ান্ত এবং শোচনীয় পরাজয়ের দিকে ঠেলে দেবেন।
পৃথিবীর ইতিহাস বরাবরই এই সত্যের সাক্ষী যে, যখন কোনো একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধভাবে এবং অটুট দেশপ্রেম বুকে ধারণ করে কোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংকটের মোকাবিলা করে, তখন বিশ্বের কোনো পরাশক্তি বা অন্যায্য অবরোধই তাদের দীর্ঘকাল পদানত করে রাখতে সক্ষম হয় না।
নিজেদের মাতৃভূমির প্রতি ইরানের সাধারণ জনগণ এবং রাষ্ট্রীয় সরকারের এই সম্মিলিত, আপসহীন ও সুদৃঢ় প্রতিরোধ আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতির জটিল মঞ্চে আত্মমর্যাদা রক্ষার এক সম্পূর্ণ নতুন, উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ও গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।