এল-ফাশের হলো উত্তর দারফুরের প্রাদেশিক রাজধানী এবং সুদানের নিয়মিত সামরিক বাহিনী সুদানিজ আর্মড ফোর্সেস (এসএএফ)-এর এই অঞ্চলের সর্বশেষ শক্তিশালী ঘাঁটি। দুই বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যে ৫০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে অবরোধের পর গত সপ্তাহান্তে আরএসএফ শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর পরপরই সেখানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের খবর আসতে শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা এই দৃশ্যকে 'হত্যাযজ্ঞের ক্ষেত্র' হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে নিরস্ত্র নাগরিকেরা চরম সহিংসতার শিকার হয়েছেন। জাতিসংঘের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, আরএসএফ যোদ্ধারা একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীসহ শত শত মানুষকে হত্যা করেছে। এই ধরনের নৃশংসতা কেবল যুদ্ধাপরাধের ইঙ্গিতই বহন করে না, বরং সুদানে চলমান মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে।
আরএসএফ কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো (হেমেদতি) টেলিগ্রাম মেসেজিং অ্যাপে দেওয়া এক পোস্টে এল-ফাশেরের ঘটনাবলী নিয়ে তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি লেখেন, "এল-ফাশেরে বেশ কিছু অনিয়ম হয়েছে। আমরা এখান থেকেই একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা করছি, এবং এই ঘোষণা কেবল মুখের কথা নয়।" তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাদের কমিটিগুলো ইতোমধ্যে এল-ফাশেরে পৌঁছে গেছে এবং "অবিলম্বে একটি তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করবে, যাতে কোনো সেনা বা কর্মকর্তা কোনো অপরাধ করলে অথবা কোনো মানুষের প্রতি সীমা লঙ্ঘন করলে তাকে দায়বদ্ধতার আওতায় আনা যায়।" দাগালোর এই স্বীকারোক্তি এবং তদন্তের প্রতিশ্রুতি, সংঘটিত অপরাধগুলোর প্রতি তাদের প্রাথমিক দায়বদ্ধতার ইঙ্গিত দিলেও, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এল-ফাশেরের পরিস্থিতিকে চরম মর্মান্তিক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সুদানে ইউনিসেফ-এর প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "পরিস্থিতি সত্যিই ভয়ংকর। এই শহরটি দীর্ঘ ৬০০ দিন ধরে অবরোধের মধ্যে ছিল, যার ফলে কোনো খাদ্য, কোনো ওষুধ বা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো মৌলিক চাহিদা সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। আর এখন আমরা দেখছি, বাসিন্দারা চরম ও তীব্র সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যা একেবারেই ভয়াবহ।"
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, রবিবার থেকে শহর দখলের পর ৩৬,০০০ এরও বেশি মানুষ এল-ফাশের ছেড়ে পালিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই শহরের চারপাশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতি বিদ্যমান মানবিক সংকটকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর কর্মকর্তা জ্যাকলিন উইলমা পার্লভিয়েট পালিয়ে আসা শরণার্থীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জানান যে, ব্যাপক জাতিগত ও রাজনৈতিক বিভেদের কারণে সেখানে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। শরণার্থীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, পালাতে না পারায় শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং পালানোর চেষ্টাকালে অন্যদেরও নৃশংসভাবে গুলি করা হয়। এই প্রতিবেদনগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, এই সহিংসতা ছিল সুচিন্তিত ও টার্গেটেড, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
এল-ফাশেরের দখল সুদানের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মোড় ঘোরানো একটি ঘটনা। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া সামরিক বাহিনী (এসএএফ) ও আধা-সামরিক বাহিনী (আরএসএফ)-এর মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ ইতোমধ্যে ৪০,০০০ এরও বেশি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং ১ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে ঘরছাড়া করেছে, যা বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে মারাত্মক মানবিক সংকটের সৃষ্টি করেছে।
এল-ফাশেরের পতন এখন আফ্রিকার তৃতীয় বৃহত্তম এই দেশটি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা দেশটি আবার বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রায় ১৫ বছর আগে সংঘাতের জেরে তেল-সমৃদ্ধ দক্ষিণ সুদান এই অঞ্চল থেকে স্বাধীন হয়েছিল। এল-ফাশেরের নিয়ন্ত্রণে আসায় দারফুর অঞ্চলে আরএসএফ-এর সামরিক ক্ষমতা আরও সুসংহত হবে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো শান্তি আলোচনাকে জটিল ও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মহল এখন অবিলম্বে এই সহিংসতা বন্ধ করে সংঘাতের একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের জন্য জোরালো কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্তে আরএসএফ-এর দেওয়া প্রতিশ্রুতিকে প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হলেও, সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে এই ধরনের তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এল-ফাশেরের মর্মান্তিক ঘটনা সুদানের দুই বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের নৃশংসতার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে চিহ্নিত হয়েছে। এই চরম মানবিক সংকট নিরসনে আঞ্চলিক ও বিশ্বশক্তির হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।