মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২০, ২০২৬
৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নাইজেরিয়ায় ‘খ্রিস্টান নিধনের’ অভিযোগ ট্রাম্পের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৫, ০৩:২২ পিএম

নাইজেরিয়ায় ‘খ্রিস্টান নিধনের’ অভিযোগ ট্রাম্পের
ছবি: AP

নাইজেরিয়ার সরকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিস্ফোরক দাবিকে "জাতীয় বাস্তবতার পরিপন্থী" বলে তীব্র ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। শুক্রবার (১ নভেম্বর) মার্কিন প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন যে, নাইজেরিয়া সরকার দেশটিতে ইসলামপন্থীদের দ্বারা "খ্রিস্টানদের গণহারে হত্যার" অনুমতি দিচ্ছে এবং এই "নৃশংসতা" বন্ধে ব্যর্থ হলে তিনি আফ্রিকান দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন।

 

আফ্রিকার সবচেয়ে জনবহুল এবং শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশটির বিরুদ্ধে এই নজিরবিহীন হুমকি নাইজেরিয়ার অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নাইজেরিয়ার সরকার এই দাবিকে ভিত্তিহীন বললেও, দেশটির দীর্ঘস্থায়ী ইসলামপন্থী বিদ্রোহ দমনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের "সহায়তা" গ্রহণে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে, তবে তা অবশ্যই দেশের "আঞ্চলিক অখণ্ডতা" বজায় রেখে হতে হবে।

 

এই উত্তেজনার সূত্রপাত শুক্রবার, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনেন। তিনি দাবি করেন, নাইজেরিয়ায় "কট্টর ইসলামি সন্ত্রাসীদের" হাতে "হাজার হাজার খ্রিস্টান" নিহত হচ্ছে। ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে একটি "কলঙ্কিত" ঘটনা হিসেবে অভিহিত করে নাইজেরিয়ার সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।

 

তিনি হুমকি দিয়ে লেখেন, "আমরা যদি আক্রমণ করি, তা হবে দ্রুত এবং হিংস্র।" ট্রাম্প আরও ঘোষণা করেন যে, তার প্রশাসন নাইজেরিয়াকে দেওয়া সমস্ত মার্কিন সাহায্য ও সহায়তা অবিলম্বে বন্ধ করে দেবে। একইসাথে তিনি ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগে নাইজেরিয়াকে আবারও "বিশেষ উদ্বেগের দেশ" (Country of Particular Concern - CPC) হিসেবে তালিকাভুক্ত করার ঘোষণা দেন। এই তালিকায় চীন, রাশিয়া, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোও রয়েছে।

 

ট্রাম্পের এই হুমকির পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ 'এক্স' (সাবেক টুইটার)-এ একটি পোস্টে এই অবস্থানকে আরও জোরালো করে বলেন, "যুদ্ধ দপ্তর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। হয় নাইজেরিয়া সরকারকে খ্রিস্টানদের রক্ষা করতে হবে, নইলে আমরা এই ভয়াবহ নৃশংসতাকারী ইসলামি সন্ত্রাসীদের নির্মূল করব।"

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আগ্রাসী মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবুর সরকার একটি সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছে। ট্রাম্পের হুমকির আগেই, নাইজেরিয়াকে "বিশেষ উদ্বেগের দেশ" হিসেবে তালিকাভুক্ত করার খবরের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট তিনুবু ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় তার দেশের প্রচেষ্টার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন।

 

রবিবার (২ নভেম্বর) প্রেসিডেন্টের একজন মুখপাত্র এই বিষয়ে আরও স্পষ্ট করে বলেন, ট্রাম্পের এই অভিযোগ নাইজেরিয়ার "জাতীয় বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না"। তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নাইজেরিয়াতেও নানা ধর্মের মানুষের বৈচিত্র্য উদযাপন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই, কারণ এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।"

 

তবে, মুখপাত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যোগ করেন। তিনি বলেন, নাইজেরিয়া তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চলমান ইসলামপন্থী বিদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের "সহায়তা" স্বাগত জানাবে, তবে তা অবশ্যই নাইজেরিয়ার সার্বভৌমত্ব এবং "আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে" পূর্ণ সম্মান জানিয়ে হতে হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে আবুজা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা সন্ত্রাস দমনে অংশীদারিত্ব চায়, কিন্তু মার্কিন সামরিক বাহিনীর একতরফা "হস্তক্ষেপ" মেনে নেওয়া হবে না।

 

নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একটি পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ওয়াশিংটনকে একটি "ঘনিষ্ঠ মিত্র" হিসেবেই দেখতে চায় এবং সহিংস চরমপন্থার বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘস্থায়ী লড়াই অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের "খ্রিস্টান নিধনের" এই আখ্যানটি নাইজেরিয়ার অত্যন্ত জটিল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে একপাক্ষিকভাবে চিত্রিত করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নাইজেরিয়া সরকার গত পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে 'বোকো হারাম' এবং এর সহযোগী 'ইসলামিক স্টেট ইন ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স' (ISWAP)-এর মতো ইসলামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিদ্রোহীরা প্রায়শই বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নৃশংস হামলা চালায়।

 

তবে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ট্রাম্পের দাবিতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বাস্তবতা হলো, এই ইসলামপন্থী বিদ্রোহের শিকার হওয়া মানুষদের মধ্যে খ্রিস্টান থাকলেও, নিহতদের সিংহভাগই মুসলিম। বোকো হারাম এবং আইএসডব্লিউএপি উভয়ই প্রধানত সেইসব মুসলিমদেরকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়, যারা তাদের উগ্রপন্থী মতাদর্শকে প্রত্যাখ্যান করে বা সরকারের প্রতি অনুগত থাকে।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই বয়ান নাইজেরিয়ার দুটি ভিন্ন সংঘাতকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এক করে ফেলেছে। প্রথমটি হলো উত্তর-পূর্বের এই সুনির্দিষ্ট ইসলামপন্থী বিদ্রোহ। আর দ্বিতীয়টি হলো নাইজেরিয়ার "মিডল বেল্ট" বা মধ্যাঞ্চলে চলমান দীর্ঘদিনের "কৃষক-পশুপালক সংঘাত"।

 

নাইজেরিয়ার মধ্যাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, যেমন প্লাটো, বেনু এবং কাদুনা, একটি ভিন্ন ধরনের, তবে সমান রক্তক্ষয়ী, সংঘাতের সাক্ষী। এই অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে দেশটির মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর এবং খ্রিস্টান-সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণের মধ্যে একটি বিভাজন রেখা হিসেবে কাজ করে।

 

এই অঞ্চলে সংঘাতের মূল কারণ ধর্ম নয়, বরং দুষ্প্রাপ্য প্রাকৃতিক সম্পদ-বিশেষত জমি ও পানি। ঐতিহ্যগতভাবে, উত্তরের ফুলানি পশুপালকরা (যারা প্রধানত মুসলিম) তাদের গবাদিপশু চারণের জন্য দক্ষিণে কৃষকদের (যারা প্রধানত খ্রিস্টান) জমির দিকে স্থানান্তরিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তন এবং মরুকরণের ফলে চারণভূমি সংকুচিত হয়ে আসায়, এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে জমি ও জলের অধিকার নিয়ে প্রায়শই ভয়াবহ সংঘর্ষ বেধে যায়।

 

এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শত শত মানুষ প্রাণ হারায়। যেহেতু এই সংঘাতে জড়িত পক্ষ দুটি ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের, তাই এই অর্থনৈতিক ও সম্পদভিত্তিক সংঘাতকে প্রায়শই একটি ধর্মীয় সংঘাতের রূপ দেওয়া হয়। ঠিক এই আখ্যানটিকেই ট্রাম্প "খ্রিস্টানদের ওপর ইসলামি সন্ত্রাসীদের" হামলা হিসেবে তুলে ধরেছেন বলে মনে করা হচ্ছে, যা দেশটির প্রকৃত পরিস্থিতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের মে মাসে প্লাটো রাজ্যের একটি ঘটনায় কৃষক ও পশুপালকদের দাঙ্গায় ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

 

নাইজেরিয়াকে "বিশেষ উদ্বেগের দেশ" (CPC) হিসেবে তালিকাভুক্ত করার ঘটনাটিও নতুন নয়। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেই নাইজেরিয়াকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন নাইজেরিয়াকে সেই তালিকা থেকে সরিয়ে নেয়, যা ছিল দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের একটি পদক্ষেপ। এখন ট্রাম্প পুনরায় সেই সিদ্ধান্তকে উল্টে দিয়ে নাইজেরিয়াকে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার কাতারে ফেললেন, যা স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার।

 

এদিকে, নাইজেরিয়ার ভেতরেও ট্রাম্পের এই সামরিক হুমকির বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মী এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ওমোয়েলে সোওোরে ট্রাম্পের এই "হস্তক্ষেপের" প্রস্তাবকে স্বাগত জানানোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈদেশিক নীতির ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, ওয়াশিংটনের সামরিক হস্তক্ষেপের একটি দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে, যা প্রায়শই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আগের চেয়ে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে রেখে গেছে।

 

সব মিলিয়ে, নাইজেরিয়া যখন তার নিজস্ব জটিল নিরাপত্তা সংকট-একদিকে বোকো হারাম বিদ্রোহ, অন্যদিকে কৃষক-পশুপালক সংঘাত-মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই একতরফা হুমকি এবং ধর্মীয় রং চড়ানো বয়ান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আবুজা এখন একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে: একদিকে যেমন কট্টরপন্থী বিদ্রোহ দমনে মার্কিন সহায়তা প্রয়োজন, অন্যদিকে তেমনি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং ট্রাম্পের এই সরলীকৃত ও বিপজ্জনক আখ্যানকে প্রতিহত করাও তাদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- Africa News