সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬
১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জেলেনস্কি ফোন করলে সাড়া দেবেন পুতিন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

জেলেনস্কি ফোন করলে সাড়া দেবেন পুতিন
ছবি : Collected

সুদীর্ঘ সময় ধরে চলমান রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আবহে এবার এক নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। পূর্ব ইউরোপের ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপটে যখন সামরিক উত্তেজনার পারদ প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী, ঠিক সেই মুহূর্তে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

 

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও ক্রেমলিনের নীতিনির্ধারক ইউরি উশাকভ সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন যে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যদি আলোচনার উদ্দেশ্যে ফোন করেন, তবে রুশ প্রেসিডেন্ট সেই ফোনালাপে অংশ নিতে এবং সাড়া দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন।

 

রবিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে দেওয়া এক বিস্তারিত বিবৃতিতে উশাকভ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন কখনোই গঠনমূলক আলোচনা বা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পথ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি।

 

যুদ্ধবিধ্বস্ত এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইউক্রেনের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হলে, মস্কো তাতে ইতিবাচকভাবেই সাড়া দেবে বলে তিনি ইঙ্গিত প্রদান করেছেন।

 

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সরাসরি কোনো ধরনের বৈঠক বা ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়নি।

 

যুদ্ধের ভয়াবহতা, ব্যাপক প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের কারণে দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত একটি বরফশীতল স্থবিরতার মধ্যে প্রবেশ করেছিল। প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মধ্যে সর্বশেষ সরাসরি ও মুখোমুখি সাক্ষাতের ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় কয়েক বছর আগে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে।

 

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত সেই ঐতিহাসিক বৈঠকটি মূলত ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ মধ্যস্থতায় ‘নরম্যান্ডি ফরম্যাট’ আলোচনার অংশ হিসেবে আয়োজিত হয়েছিল। সেই বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা।

 

কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয় এবং ২০২২ সালের সামরিক অভিযান সেই সমস্ত কূটনৈতিক অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দেয়। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সরাসরি ও প্রত্যক্ষ বৈঠকের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে।

 

ইউক্রেনীয় প্রশাসন মনে করে, শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই জটিল ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে উদ্দেশ করে একটি উন্মুক্ত বা খোলা চিঠি লিখেছিলেন।

 

সেই চিঠিতে তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরে রক্তপাত বন্ধের লক্ষ্যে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসার এক অত্যন্ত জোরালো ও আবেগঘন আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে ভিন্ন একটি চিত্র উঠে এসেছে।

 

কিয়েভ ইনডিপেনডেন্ট-এর সাম্প্রতিক এক গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমানে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠক এড়িয়ে চলার কৌশল গ্রহণ করেছে। এর পরিবর্তে ক্রেমলিন ফোনালাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

 

ইউক্রেনীয় প্রশাসনের এক অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে নিশ্চিত করেছেন যে, কিয়েভের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে ফোনালাপের মাধ্যমেও আলোচনার একটি প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তবে সেই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে এখনো কোনো সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।

 

শুক্রবার ক্রেমলিনের শীর্ষ মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে এই বিষয়ে রাশিয়ার আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, প্রেসিডেন্ট পুতিন যেকোনো গঠনমূলক সংলাপে বসতে সর্বদা আগ্রহী এবং প্রস্তুত রয়েছেন।

 

প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ফোনে কথা বলবেন কি না-সাংবাদিকদের এমন একটি সরাসরি প্রশ্নের জবাবে পেসকভ বলেন, কিয়েভের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের ফোন আসেনি। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত বল এখন ইউক্রেনের কোর্টে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

 

উল্লেখ্য যে, এর আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের বর্তমান নেতাকে অবৈধ বলে অভিহিত করে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন যে, কেবল আগে থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুমোদিত এবং চূড়ান্ত করা কোনো চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর করার জন্যই তিনি প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে একই টেবিলে বসতে সম্মত হবেন।

 

এর বাইরে সাধারণ আলোচনার জন্য সরাসরি সাক্ষাতের কোনো প্রয়োজনীয়তা ক্রেমলিন দেখছে না। শান্তি আলোচনার রূপরেখা ও কাঠামো কেমন হবে, তা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে নানামুখী বিশ্লেষণ ও বিতর্ক চলছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মনে করেন, শান্তি আলোচনার প্রাথমিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি হওয়া উচিত একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে।

 

তার মতে, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেন-এই তিন প্রধান অংশীদারের মধ্যেই প্রাথমিক আলোচনা হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই আলোচনায় ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোকে যুক্ত করার কোনো আবশ্যকতা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি অত্যন্ত কৌশলী উত্তর দেন।

 

পেসকভ জানান যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মস্কোর নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বাস্তবতার নিরিখে অন্তত প্রথম কয়েকটি ধাপ এই তিন পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকাটা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত যৌক্তিক। তবে ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ এই বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন ও বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।

 

তিনি মনে করেন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় ইউরোপকেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত। কারণ, সংঘাত-পরবর্তী সময়ে যেকোনো কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছানো এবং তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও অনস্বীকার্য।

 

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, শান্তি আলোচনায় ইউরোপকে যুক্ত করার পেছনে রাশিয়ার এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক কৌশল লুকিয়ে রয়েছে।

 

মস্কো চাইছে পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের বিষয়টি নিয়ে একটি চূড়ান্ত ছাড় আদায় করতে। প্রেসিডেন্ট পুতিন শুরু থেকেই অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করে আসছেন যে, পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর ক্রমাগত সম্প্রসারণ এবং রাশিয়ার সীমান্তের দিকে এই জোটের আগ্রাসী পদচারণাই মূলত ইউক্রেন যুদ্ধের মূল ও প্রধান কারণ।

 

তাই যেকোনো শান্তি চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে মস্কো ন্যাটোর সম্প্রসারণ নীতির একটি স্থায়ী ও লিখিত অবসান চাইছে, আর ইউরোপকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারলে এই ছাড় আদায় করা সহজতর হবে বলে ক্রেমলিনের নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করেন।

 

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই সংঘাতের রেশ ধরে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যেও এক ধরনের তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে।

 

এমন একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ন্যাটোভুক্ত কিছু নির্দিষ্ট দেশকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অত্যন্ত কঠোর ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকার এক বিশেষ পরামর্শ দিয়েছে।

 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই তথ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের বেশ কয়েকটি ফ্রন্টলাইন রাষ্ট্রকে মস্কোকে অহেতুক উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে এবং নিজেদের কূটনৈতিক বিবৃতিতে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে।

 

এই অত্যন্ত গোপনীয় ও কৌশলগত নির্দেশনার বিষয়ে অবগত একাধিক কূটনৈতিক সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, ন্যাটো জোটের শীর্ষ নেতাদের এই মর্মে সতর্ক করা হয়েছে যে, রাশিয়ার প্রকাশ্য ও তীব্র নিন্দা জানিয়ে লাগাতার বিবৃতি প্রদান করা হলে তা ওই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি দুর্বল ও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের নীতিবিষয়ক প্রধান এলব্রিজ কোলবিসহ পেন্টাগনের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন রুদ্ধদ্বার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউরোপের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সর্বদাই তাদের মিত্রদের পাশে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবে।

 

কিন্তু মার্কিনিদের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ অনুরোধ করা হয়েছে, মিত্ররা যেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে খুব বেশি সরব না হন এবং অযথা কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক হৈচৈ বা উত্তেজনার সৃষ্টি না করেন।

 

পরাশক্তিগুলোর এই ধরনের স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতির বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য চাওয়া হলে, সংস্থাটি কোনো ধরনের মন্তব্য করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে পেন্টাগনের এক মুখপাত্র অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে জানিয়েছেন যে, মিত্র দেশগুলোর মধ্যে হওয়া যেকোনো ধরনের ব্যক্তিগত বা দ্বিপক্ষীয় কথোপকথন সর্বদাই ব্যক্তিগত ও গোপনীয় থাকে, যা জনসমক্ষে প্রকাশ করা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী।

 

পরিশেষে বলা যায়, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার এই যুদ্ধ কেবল দুটি দেশের ভৌগোলিক সীমানাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি আজ বৈশ্বিক কূটনীতির এক অন্যতম জটিল ও বহুমুখী সমীকরণে পরিণত হয়েছে, যার প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে পুরো বিশ্ব।