এই যুগান্তকারী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত শুক্রবার দেশটির ৫৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা। অন্যদিকে, ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম এবং জনগণের বিশ্বাসভঙ্গের মতো গুরুতর অপরাধের সন্দেহে সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়াকে গৃহবন্দি করে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সরকারি কৌঁসুলিরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো প্যারাগুয়ের এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ভূমিকম্প হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সান্তিয়াগো পেনিয়াকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের আইনি প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়েছে।
শুক্রবার দিনের শুরুতে প্যারাগুয়ের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটের ৪৫ জন সদস্যের মধ্যে ৪৪ জনই প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের পক্ষে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। মাত্র একজন সদস্য এই গুরুত্বপূর্ণ ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার দেশটির আইনসভার নিম্নকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদে পেনিয়ার অভিশংসনের প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। সেখানে প্রস্তাবের পক্ষে ৭৮টি ভোট পড়ে এবং বিপক্ষে একটি ভোটও পড়েনি। নিম্নকক্ষে নিরঙ্কুশ সমর্থন পাওয়ার পরই মূলত সিনেটে পেনিয়াকে চূড়ান্তভাবে অপসারণের পথ প্রশস্ত হয়।
একই সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানার বিরুদ্ধেও অভিশংসন শুনানি শুরু করার একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু আইনপ্রণেতারা তা তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে দেন। ফলশ্রুতিতে অভিশংসনের রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে সান্তিয়াগো পেনিয়ার মেয়াদের এক আকস্মিক ও অমর্যাদাকর সমাপ্তি ঘটে।
প্যারাগুয়ের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারকারী রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল কলোরাডো পার্টির একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন সান্তিয়াগো পেনিয়া। ১৯৪৮ সাল থেকে দেশটির শাসনব্যবস্থায় এই দলটি ব্যাপক আধিপত্য বজায় রেখে চলেছে।
আশ্চর্যজনকভাবে, এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ভয়াবহতা এতটাই ব্যাপক ছিল যে পেনিয়ার নিজের দলও তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অভিশংসন প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে। সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং কলোরাডো পার্টির বর্তমান শীর্ষ নেতা হোরাসিও কার্তেস এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান যে, প্রজাতন্ত্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার বৃহত্তর স্বার্থেই তারা প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়ার অভিশংসনকে সমর্থন করতে বাধ্য হয়েছেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পেনিয়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষার যুক্তি দেখিয়ে নিজেই পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু প্যারাগুয়ের কংগ্রেস তার সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে অভিশংসন প্রক্রিয়াটিই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
কারণ পদত্যাগের সুযোগ পেলে পেনিয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে আজীবন সিনেটের সদস্য হওয়ার আইনি অধিকার ধরে রাখতে পারতেন, যা তাকে বিচারিক দায়মুক্তি বা ইমিউনিটি প্রদান করত। তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতেই কংগ্রেস এই কঠোর পথ বেছে নেয়।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় সান্তিয়াগো পেনিয়া দেশবাসীর উদ্দেশে লেখেন যে, তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, যারা এই আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছেন, তাদের যন্ত্রণা ও ক্ষোভ তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারছেন।
তবে তিনি নিজে এই অভিশংসন শুনানিতে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না; তার পক্ষে আইনজীবীদের একটি দল শুনানিতে অংশ নেয়। পেনিয়া এক বিবৃতিতে জানান, তিনি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করতে চাননি যা দেশে আরও বেশি রাজনৈতিক বিভক্তি বা অস্থিতিশীলতার জন্ম দিতে পারে।
নিজের ব্যক্তিগত পরিণতির চেয়ে দেশ ও জাতির নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়াই তার প্রধান দায়িত্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে ক্ষমতা ছাড়ার আগে তিনি সিনেটে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে অভিশংসন শুনানি পরিচালনার বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার যথাযথভাবে প্রয়োগের জন্য তিনি শুনানির সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছিলেন, কারণ তার মতে, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তাকে যে সময়টুকু বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা ন্যায়বিচারের স্বার্থে একেবারেই অপর্যাপ্ত ছিল।
প্যারাগুয়ের এই স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উয়েনো ব্যাংক নামের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। গত মঙ্গলবার প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে, উয়েনো ব্যাংক আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আর্থিক সচ্ছলতার ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
সহজ কথায়, ব্যাংকটির যে পরিমাণ ঋণ এবং অন্যান্য আর্থিক দায়বদ্ধতা রয়েছে, তার বিপরীতে তাদের কাছে পর্যাপ্ত জামানত বা নগদ সম্পদ মজুত নেই। এই ঘোষণার পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং আমানতকারীদের অর্থের প্রাথমিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে ব্যাংকটির অবশিষ্ট সম্পদ অন্যান্য সুরক্ষিত ব্যাংকগুলোতে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করে।
কিন্তু এই আকস্মিক বিপর্যয়ের কারণে উয়েনো ব্যাংকের লাখ লাখ সাধারণ গ্রাহক রাতারাতি চরম বিপাকে পড়েন এবং নিজেদের ব্যাংক হিসাবের জমানো অর্থ ও পেনশনের টাকা ব্যবহারের সুযোগ থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হন।
উয়েনো ব্যাংকের বিস্তৃতি ছিল অত্যন্ত বিশাল। প্রতিষ্ঠানটির মোট গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় ত্রিশ লাখ, যা প্যারাগুয়ের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করে দেশের অন্যতম শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
ব্যাংকটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, তাদের উদ্ভাবনী ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে প্যারাগুয়ের দশ লাখেরও বেশি প্রান্তিক মানুষ জীবনে প্রথমবারের মতো ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ পেয়েছিলেন।
বিশেষ করে ২০২৩ সালে ‘উয়েনো’ নামে একীভূত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি অভাবনীয় দ্রুততায় ব্যবসা সম্প্রসারণ করে এবং আমানত সংগ্রহের দিক থেকে এটি প্যারাগুয়ের পঞ্চম বৃহত্তম ব্যাংকের মর্যাদা লাভ করে। এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির পেছনে সরকারি তহবিলের প্রায় ৮০ কোটি ডলারের এক বিশাল বিনিয়োগ সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল, যা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এই কেলেঙ্কারিতে সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট পেনিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগটি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। ২০২৩ সালে উয়েনো ব্যাংকের মূল নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের একজন অন্যতম শেয়ারধারী হিসেবে সান্তিয়াগো পেনিয়ার নাম জনসমক্ষে উঠে আসে।
যদিও তিনি পরবর্তীতে দাবি করেছিলেন যে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকেই তিনি তার নিজস্ব সমস্ত শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তবে তদন্তকারীরা এখন গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন যে, সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই উয়েনো ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি এবং জবাবদিহির আওতা থেকে কোনো ধরনের বেআইনি ছাড় পেয়েছিল কি না।
ব্যাংকটিতে রাষ্ট্রীয় পেনশন তহবিলের প্রায় ৩৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল, যার ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। এই নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয়ের ঘটনায় পেনিয়া ছাড়াও প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান কার্লোস কারভালোর বিরুদ্ধেও সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
উয়েনো ব্যাংকের কার্যক্রমে যথাযথ তদারকি করতে ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে, যার জেরে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই জালিয়াতি, বিশ্বাসভঙ্গ, তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা আদায়ের মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনায় ব্যাংকটির প্রধান শেয়ারধারী মিগেল ভাসকেজসহ অন্তত ২৭ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এমন এক চরম অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে প্যারাগুয়ের রাষ্ট্রপতির গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ৫২ বছর বয়সি পেদ্রো আলিয়ানা। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি প্যারাগুয়ের দক্ষিণাঞ্চলের নেমবুকু প্রদেশের গভর্নর হিসেবে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পরবর্তীতে তিনি প্রায় এক দশক ধরে দেশের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করেন এবং এর মধ্যে তিন বছর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ২০২৩ সালে সান্তিয়াগো পেনিয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আলিয়ানা ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এবং জটিল এক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তাকে এখন নতুন সরকারের নেতৃত্ব দিতে হবে। একদিকে ভেঙে পড়া আর্থিক খাতকে পুনরুদ্ধার করে লাখ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের জমানো অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্যারাগুয়ের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা-এই দুই বিশাল চ্যালেঞ্জ এখন নতুন প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানার সামনে অপেক্ষা করছে।