যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনার মধ্যেই রাশিয়ার এই আক্রমণ যুদ্ধের ভয়াবহতা ও অনিশ্চয়তাকে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে নিয়ে এসেছে। টানা চার বছর ধরে চলতে থাকা এই সংঘাত নিরসনে যখন আশার আলো দেখা যাচ্ছিল, তখনই এই হামলা সেই প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ধাক্কা দিল।
কিয়েভের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরের দিকে চালানো এই হামলায় শহরের একাধিক আবাসিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পেচারস্ক এবং পূর্বাঞ্চলীয় দিনিপ্রোভস্কি জেলায় মিসাইল ও ড্রোন আঘাত হানে।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো নিশ্চিত করেছেন যে, এই হামলায় ওই এলাকাগুলোর বেশ কয়েকটি আবাসিক ভবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পরপরই ঘটনাস্থলে জরুরি পরিষেবার কর্মীদের আগুন নেভাতে ও উদ্ধারকাজ চালাতে দেখা যায়। আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করেন, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত নগরীর করুণ চিত্রটিকেই পুনরায় ফুটিয়ে তোলে।
শুধু আবাসিক ভবনই নয়, ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, রাতভর চলা এই হামলায় তাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে হামলার ধরন বা ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। রাজধানী কিয়েভ ছাড়াও দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি এলাকাতেও জোরদার হামলার খবর পাওয়া গেছে।
সোমবার রাতভর হামলার পর মঙ্গলবার ভোরে সেখানে একটি সেবাদানকারী ট্রাক লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়। ক্রমাগত বিমান হামলায় সুমি অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও জনজীবন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। রণাঙ্গনের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গিয়েছিল কূটনৈতিক টেবিলে। রবিবার জেনেভায় মার্কিন ও ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য অলেক্সান্ডার বেভজ সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছিলেন যে, এই আলোচনা ছিল অত্যন্ত গঠনমূলক এবং উভয় পক্ষই অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। মূলত রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি গ্রহণযোগ্য শান্তি পরিকল্পনা প্রণয়ন করাই ছিল এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।
তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, জেনেভা আলোচনার পর সংশোধিত কোনো পরিকল্পনা এখনো মস্কোর হাতে পৌঁছায়নি। রাশিয়ার এই বক্তব্য এবং পরবর্তী সময়ে কিয়েভে হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, আলোচনার টেবিলে অগ্রগতির আভাস মিললেও বাস্তবে সংঘাতের তীব্রতা কমার কোনো লক্ষণ নেই।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি চুক্তির আলোচনা চলাকালীন এমন হামলা প্রতিপক্ষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হতে পারে। সব মিলিয়ে, যুদ্ধের চতুর্থ বছরে দাঁড়িয়েও ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জন্য শান্তি এখনো সুদূরপরাহত।