তিনি দৃঢ়কণ্ঠে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং নিজ দেশের নাগরিকদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, স্পেন কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মতো কোনো পরাশক্তি বা বিদেশি রাষ্ট্রের নির্দেশে পরিচালিত হয় না। আগামী ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য স্পেনের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি এই জোরালো বার্তা প্রদান করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে তিনি স্পেনের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে বর্তমান ইউরোপীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করছে, যেখানে তিনি মূলত পশ্চিমা বিশ্বের অন্ধ অনুকরণের বাইরে গিয়ে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং মানবিক অবস্থানের পক্ষে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
আগামী ২৯ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচন স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ যাত্রাপথের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পেদ্রো সানচেজ তার নির্বাচনী প্রচারণার মূল হাতিয়ার হিসেবে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে বেছে নিয়েছেন।
তিনি তার এক দীর্ঘ ও আবেগঘন ভাষণে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, এই নির্বাচনের ফলাফল সমগ্র বিশ্বকে এই বার্তাই দেবে যে, স্পেনের রাষ্ট্রীয় নীতি এবং ভবিষ্যৎ কেবল স্পেনের জনগণের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেছেন, "আগামী ২৯ নভেম্বর আমরা ভোটের মাধ্যমে তাদের জানিয়ে দেব, স্পেন পরিচালিত হবে স্পেনের ভেতর থেকেই।
ওয়াশিংটন, তেল আবিব, বুয়েনস এইরেস কিংবা মস্কো থেকে নয়; বরং স্পেন থেকেই।" তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী ডানপন্থি এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন অথচ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
স্পেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক ইন্ধন বা পরোক্ষ চাপকে তিনি সম্পূর্ণরূপে এবং অত্যন্ত কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল দিক ছিল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট, বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের তীব্র বিরোধিতা।
পেদ্রো সানচেজ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে গাজায় চলমান সামরিক অভিযানকে সরাসরি 'গণহত্যা' হিসেবে আখ্যায়িত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র হয়েও স্পেনের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ অনেক পশ্চিমা দেশই ইসরায়েলের সমালোচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে থাকে।
তিনি ফিলিস্তিন নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি তার সরকারের অকুণ্ঠ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যা মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি স্পেনের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতারই প্রতিফলন। একই সঙ্গে, সামরিক পরাশক্তিগুলোর দ্বারা ইরানের বিরুদ্ধে চলমান উসকানিমূলক পদক্ষেপ এবং সামরিক উত্তেজনার কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি।
পেদ্রো সানচেজ গভীরভাবে মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধ বা সংঘাত কেবল ওই অঞ্চলের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শান্তি, অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। তাই তিনি যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বর্তমানে উগ্র ডানপন্থি শক্তিগুলোর যে ব্যাপক উত্থান ঘটছে, তার বিরুদ্ধে একটি শক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী।
তিনি তার দেশবাসীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, স্পেনকে কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক উগ্র ডানপন্থি শক্তির একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটি বা তাদের রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনের উঠানে পরিণত হতে দেওয়া হবে না।
তার এই মন্তব্যের লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত সেই সব বৈশ্বিক পরাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব, যারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডানপন্থি এবং রক্ষণশীল মতাদর্শকে অত্যন্ত সুকৌশলে উসকে দিচ্ছে।
পেদ্রো সানচেজ তার দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় ও মতাদর্শগত সহনশীলতা এবং প্রগতিশীল আদর্শকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তার মতে, আধুনিক স্পেনের সমাজব্যবস্থা বহুত্ববাদ এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যা কোনো বিদেশি ডানপন্থি শক্তির অন্যায্য চাপে কখনোই নতিস্বীকার করবে না।
পররাষ্ট্রনীতির পাশাপাশি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং সামাজিক কল্যাণমূলক নীতিগুলোও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদের তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পাঁচ শতাংশ সামরিক বা প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার যে অযৌক্তিক এবং একপেশে প্রস্তাব দিয়েছেন, পেদ্রো সানচেজ তা সরাসরি এবং কোনো রাখঢাক ছাড়াই প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি অত্যন্ত যুক্তিসংগতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, স্পেনের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো এবং সামাজিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে সামরিক খাতে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় এবং তা স্পেনের সাধারণ জনগণের মৌলিক স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সামরিকীকরণ এবং অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ প্রস্তুতির বদলে তিনি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার সরকারের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, সামাজিক সুরক্ষার বলয় বৃদ্ধি করা এবং দেশের ক্রমবর্ধমান প্রবীণ নাগরিকদের জন্য একটি টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
পেদ্রো সানচেজ তার বক্তৃতায় দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের যে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দিয়েছেন, তা সাধারণ স্প্যানিশ নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন যে, একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার সামরিক অস্ত্রাগারে বা ধ্বংসাত্মক সমরাস্ত্রে নিহিত নয়, বরং তার নাগরিকদের উন্নত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মধ্যে নিহিত।
সামরিক ব্যয় অকারণে বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর মন রক্ষা করার চেয়ে তিনি নিজ দেশের জনগণের মৌলিক অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকেই তার সরকারের প্রধান এবং পবিত্র নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন।
স্পেনের স্বাস্থ্যখাত এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও বেশি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার এই জনকল্যাণমুখী নীতিগুলো নির্বাচনী প্রচারণায় তাকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির আরও কাছাকাছি নিয়ে গেছে।
পরিশেষে বলা যায়, পেদ্রো সানচেজের এই অত্যন্ত সময়োপযোগী, বুদ্ধিদীপ্ত এবং সাহসী বক্তব্য কেবল স্পেনের নির্বাচনী রাজনীতির গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বৈশ্বিক চাপের মুখেও একটি স্বাধীন দেশ তার নিজস্ব নীতি, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে পারে। ওয়াশিংটন বা তেল আবিবের মতো প্রতাপশালী পরাশক্তিগুলোর রক্তচক্ষুকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে ফিলিস্তিনের অধিকারের পক্ষে অবিচলভাবে দাঁড়ানো এবং সামরিক ব্যয়ের অযৌক্তিক চাপ সাহসিকতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করা স্পেনের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
আগামী ২৯ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে স্পেনের সচেতন জনগণ তাদের মূল্যবান ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে পেদ্রো সানচেজের এই স্বাধীন এবং জনকল্যাণমুখী নীতিগুলোকেই সমর্থন জানাবে বলে প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
স্পেনের এই স্বাধীন, মানবিক ও নিরপেক্ষ অবস্থান আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে, বিশেষ করে ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও একটি অনুপ্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।