খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যথাযথ প্রস্তুতি ও বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দেশের পোল্ট্রি বাজার গুটিকয়েক বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা অস্তিত্ব সংকটে পড়বেন এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাত অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মুরগির সংখ্যা ছিল ২৬ কোটি ৮৩ লাখ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৬০ লাখ ৭০ হাজারে।
প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজারের উৎপাদন ব্যবস্থা অনেকাংশেই নির্ভর করে সময়মতো এক দিন বয়সী বাচ্চা সরবরাহের ওপর। সরকার বলছে, দেশীয় শিল্পকে স্বনির্ভর করতেই আমদানিনির্ভরতা কমানোর এই উদ্যোগ। তবে খামারিদের দাবি, অভ্যন্তরীণ বাজারে বাচ্চার চাহিদা পূরণের পূর্ণ সক্ষমতা এখনও তৈরি হয়নি।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে। তখন ক্ষুদ্র খামারিরা নির্ধারিত চড়া দামে বাচ্চা কিনতে বাধ্য হবেন, যা কার্যত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করবে।
নীতিমালায় ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ আমদানির সুযোগ রাখা হলেও এই শব্দবন্ধটির অস্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংকটকালে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম ও পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমানের মতে, পোল্ট্রি উৎপাদন একটি দীর্ঘমেয়াদি জৈবিক প্রক্রিয়া। হঠাৎ কোনো কারণে দেশে প্যারেন্ট স্টক বা জিপি স্টকের ক্ষতি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাণিজ্যিক বাচ্চা আমদানির সুযোগ বন্ধ থাকাটা আত্মঘাতী হতে পারে।
এতে ডিম ও মুরগির মাংসের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরির ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমানে দেশে ডিমের উৎপাদন ২৪৪০ কোটি ছাড়ালেও বাচ্চা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন হবে। অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান দাবি করেছেন, এটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়।
২০২১ সাল থেকে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে এই নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। তিনি জানান, গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক আমদানির সুযোগ অব্যাহত থাকছে, যাতে দেশীয় উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
সরকারের মূল লক্ষ্য আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে একটি টেকসই ও নিরাপদ পোল্ট্রি শিল্প গড়ে তোলা। তবে খামারি ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থ রক্ষা ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে ধাপে ধাপে এবং বাস্তবসম্মত উপায়ে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত।