রোববার (১৪ জুন) নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক এই বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের ভূখণ্ড ও গ্রিড ব্যবহার করা অপরিহার্য হওয়ায় তাদের অনুমোদনের ওপরই পুরো বিষয়টি নির্ভরশীল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ পরিবহন লাইনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণ দেখিয়ে এই অতিরিক্ত সরবরাহের অনুমোদন আটকে দিয়েছে।
তাছাড়া, নতুন একটি সংশোধিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এবং নেপাল ও ভারতের জ্বালানি বিভাগের সচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক বিষয় এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বর্ষা মৌসুমে নেপাল প্রচুর পরিমাণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করে এবং নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে সেই বাড়তি বিদ্যুৎ বাংলাদেশ ও ভারতে রপ্তানি করে।
অপরদিকে শীতকালে নদীর পানি কমে গেলে তারা উল্টো ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে থাকে। গত ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় নেপাল ও ভারতের সচিব পর্যায়ের কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ওই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশে আগে থেকে চলমান ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত আরও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির বিষয়ে একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এছাড়া ওই বৈঠকে এই সরবরাহ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যাপারেও সব পক্ষ একমত পোষণ করেছিল। কাঠমান্ডু পোস্ট তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সেই চুক্তির আলোকে নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্য সংস্থা লিমিটেডের কাছে বাংলাদেশে বাড়তি ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার জন্য অনুরোধ জানায়।
কিন্তু ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্য সংস্থা নেপালকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ সরবরাহের যে লাইনটি চালু আছে, সেটি দিয়ে এই মুহূর্তে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
নেপালের বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বিদ্যুৎ বাণিজ্য বিভাগের পরিচালক বাহাদুর থাপা এই পরিস্থিতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এবার বাংলাদেশে শুধুমাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎই যাবে।
যদিও বাড়তি ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানির ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি এখনো চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয়নি, কিন্তু আগের ৪০ মেগাওয়াট সরবরাহের মতোই তারা ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্য সংস্থার মাধ্যমে এই বাড়তি বিদ্যুৎ রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে যে, বাড়তি ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরিবহন করার মতো কারিগরি সক্ষমতা তাদের বর্তমান গ্রিডে নেই। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বাড়তি বিদ্যুৎ রপ্তানি নিশ্চিত করতে নেপাল ও ভারতকে ভবিষ্যতে আবারও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসতে হবে।
তবে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঠিক করা হয়নি। উল্লেখ্য, দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশে নেপালের বিদ্যুৎ রপ্তানির ব্যাপারে ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
সেই চুক্তির ভিত্তিতে ওই বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথমবার নেপাল বাংলাদেশে সফলভাবে বিদ্যুৎ পাঠায়। ওইদিন পরীক্ষামূলকভাবে ১২ ঘণ্টা ধরে বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় নেপালে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে ঢালকেবার-মুজাফ্ফরপুর চারশ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন দিয়ে ভারতের গ্রিডে প্রবেশ করে।
এরপর সেটি ভারতের বহরমপুর ও বাংলাদেশের ভেড়ামারা চারশ কেভি ট্রান্সমিশন লাইন দিয়ে সফলভাবে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।