বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে বাংলাদেশের মতো অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির গভীর চেষ্টায় কংগ্রেস, বিজেপি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

ভারতে বাংলাদেশের মতো অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির গভীর চেষ্টায় কংগ্রেস, বিজেপি
ছবি : Collected

ভারতের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ এক অভূতপূর্ব উত্তেজনার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। রাজপথে লাগাতার আন্দোলন এবং ধারাবাহিক বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ ও নেপালের মতো একটি চরম অরাজক এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করছে বলে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছে ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

 

বৃহস্পতিবার ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিরোধী দলগুলোর সর্বভারতীয় জোট ‘ইনডিয়া’ এবং নতুন প্রজন্মের তরুণদের সমন্বয়ে গঠিত সম্পূর্ণ নতুন ধারার রাজনৈতিক মঞ্চ ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ভারতীয় জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করা হয়েছে।

 

ক্ষমতাসীন দলটির দাবি, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা এবং লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণের জন্য বর্তমানে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং সেই অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়নেই তারা সমগ্র দেশে সুপরিকল্পিতভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টির পথ বেছে নিয়েছেন।

 

বুধবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিরোধী জোট ‘ইনডিয়া’র ব্যানারে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচির বেশ কয়েকটি খণ্ডিত ভিডিও ফুটেজ গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে ভারতীয় জনতা পার্টির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারি এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলো সর্বসমক্ষে দায়ের করেন।

 

তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন যে, রাজধানী দিল্লির রাজপথে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, তার বোন ও দলের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র এবং কংগ্রেসের অসংখ্য দলীয় কর্মী যেভাবে দায়িত্ব পালনরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আগ্রাসীভাবে হাতাহাতি ও সংঘাতপূর্ণ আচরণে লিপ্ত হয়েছেন, তা থেকে এই দলটির মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।

 

প্রদীপ ভাণ্ডারি একটি বিশেষ ভিডিও বার্তায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, কংগ্রেসের বর্তমান রাজনৈতিক ব্লুপ্রিন্ট বা কৌশল হলো নেপাল ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণঅভ্যুত্থানের মতো ভারতের বুকেও একটি ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতির বিস্তার ঘটানো এবং একটি নির্বাচিত ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকারকে অসাংবিধানিক উপায়ে অস্থিতিশীল করে তোলা।

 

এদিকে, বিরোধী দলগুলোর এই সরকারবিরোধী আন্দোলন কেবল রাজধানী দিল্লির বুকেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতেও। বৃহস্পতিবার কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরুর ঐতিহাসিক ফ্রিডম পার্কে ভারতের নির্বাচন কমিশনের দেশব্যাপী ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে একটি বিশেষ ‘জনতার আদালত’ বা গণ-শুনানি কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

 

এই অভিনব ও প্রতিবাদী মঞ্চে সশরীরে অংশগ্রহণ করেন বর্তমান ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় রাজনৈতিক মঞ্চ ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনপ্রিয় সমাজমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ধ্রুব রাঠী।

 

এই জনতার আদালত কর্মসূচি থেকে পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের বিভিন্ন বৈষম্যমূলক নীতির প্রতিবাদ স্বরূপ একটি অভিনব ‘জুতো প্রদর্শন’ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে সিজেপির ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব।

 

বেঙ্গালুরুর এই বিশাল সমাবেশ থেকে ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে অত্যন্ত প্রত্যক্ষ এবং গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি তার দীর্ঘ ও জোরালো বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে ভোট চুরি’র মতো মারাত্মক অভিযোগ আনেন, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

অভিজিৎ দীপকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, ভারতের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার তার পদ থেকে অবিলম্বে পদত্যাগ না করা পর্যন্ত দেশের আপামর ছাত্র-জনতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এই সম্মিলিত বিক্ষোভ ও রাজপথের আন্দোলন নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকবে।

 

দেশব্যাপী ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে একতরফাভাবে কাজ করার অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের এই দাবিটি বর্তমানে ভারতের বিরোধী দলগুলোর অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

 

অন্যদিকে, ভোটার তালিকা সংশোধনে দেশব্যাপী ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ এবং নিরপেক্ষতা হারানোর অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দ্রুত পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লির প্রাণকেন্দ্র যন্তর মন্তরে একটি বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছিল কংগ্রেসের অঙ্গ সংগঠন ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেস।

 

কিন্তু সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে দিল্লি পুলিশ এই গুরুত্বপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচির কোনো প্রকার আইনি অনুমতি প্রদান করেনি। পুলিশের এই একপেশে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পরিপন্থী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেস।

 

দেশের সাধারণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করার অভিযোগ তুলে দায়ের করা এই আইনি আবেদনটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আদালত শুক্রবার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শুনানির দিন ধার্য করেছেন, যার দিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশের রাজনৈতিক মহল।

 

দিল্লি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জালিয়াতি এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে বুধবার মধ্য দিল্লিতে বিরোধী জোট ‘ইনডিয়া’র পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভে ব্যাপক ও অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

 

পুলিশের দাবি অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা পুলিশের দেওয়া নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে জোরপূর্বক এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সাথে তাদের ব্যাপক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার ঘটনায় লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রসহ কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ও স্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে অন্তত দুটি নতুন মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশ স্টেশনে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

 

পুলিশের এই আইনি পদক্ষেপকে বিরোধী দলগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার একটি ঘৃণ্য অপচেষ্টা বলে আখ্যায়িত করেছে। বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে আয়োজিত জনতার আদালতে উপস্থিত হয়ে লাখো মুক্তিকামী জনতার উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন ও উদ্দীপনামূলক বক্তব্য রাখেন জনপ্রিয় সমাজমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ধ্রুব রাঠী।

 

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ভার্চুয়াল জগতের বাইরে এসে সরাসরি রাজপথের কোনো গণ-আন্দোলনে এটিই তার জীবনের প্রথম আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ। তিনি তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, "এটি রাজপথে আমার জীবনের প্রথম কোনো সরাসরি আন্দোলন।

 

গতকাল যখন আমি এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার জন্য রাস্তায় নামলাম, তখন দেখলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে অসংখ্য পোস্ট ভাইরাল হচ্ছে যে, ধ্রুব রাঠী নাকি ভারতের সরকার পরিবর্তন করতে মাঠে নেমেছেন।

 

" তিনি ভারতের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর অহংকারকে কটাক্ষ করে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ভাষায় বলেন, "প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হয়তো তার নিজস্ব রাজনৈতিক গণ্ডি থেকে ভাবছেন যে, আমার ব্যক্তিগত সমস্যা কেবল তাকে নিয়েই; কিন্তু নির্জলা সত্য হলো, আজ পুরো ভারতবর্ষের প্রতিটি সাধারণ মানুষেরই তাকে এবং তার এই স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাকে নিয়ে গভীর সমস্যা রয়েছে।"

 

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বহুমাত্রিক আন্দোলন এবং তার বিপরীতে সরকারি দলের আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেশের আগামী নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

একদিকে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো জোটবদ্ধ হয়ে তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় রাজপথে নেমেছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের তরুণ সমাজ এবং ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সাররাও সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন। সব মিলিয়ে ভারতের রাজনীতি এক চরম নাটকীয়, সংঘাতময় এবং যুগান্তকারী অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে।

 

- দ্য হিন্দু, পিটিআই