বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিজেপি সমর্থক পরিবার থেকে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে, নেহা বোরার উত্থানের নেপথ্য কাহিনি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

বিজেপি সমর্থক পরিবার থেকে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে, নেহা বোরার উত্থানের নেপথ্য কাহিনি
ছবি : Collected

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ছাত্র ও যুব রাজনীতির উত্তাল প্রেক্ষাপটে এক নতুন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন নেহা বোরা। রাজনৈতিক আদর্শের এক সম্পূর্ণ বিপরীত মেরু থেকে উঠে এসে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন দেশের আপামর ছাত্রসমাজের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ।

 

যে পরিবারে তিনি বেড়ে উঠেছেন, সেটি ঐতিহাসিকভাবেই ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত। অথচ সেই পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে পেছনে ফেলে নেহা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আদর্শের পতাকাবাহী।

 

তিনি বর্তমানে ভারতের অন্যতম প্রধান বামপন্থী ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সর্বভারতীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এই সংগঠনটি মূলত নকশালপন্থী রাজনৈতিক দল সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র শাখা।

 

ডানপন্থী আদর্শের একটি সুরক্ষিত বলয় থেকে বেরিয়ে এসে কীভাবে একজন তরুণী দেশের অন্যতম প্রধান বামপন্থী ছাত্র নেত্রীতে পরিণত হলেন, তা আজ সমগ্র ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের কাছে এক পরম বিস্ময় এবং গভীর আলোচনার বিষয়।

 

গত সোমবার বিকেলে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এক বিশাল ছাত্র সমাবেশে বক্তব্য রাখতে ওঠেন নেহা বোরা। সেই মুহূর্তে তার শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়।

 

টানা কয়েক দিনের নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি এবং দীর্ঘক্ষণ স্লোগান দেওয়ার কারণে তার গলা সম্পূর্ণ ভেঙে গিয়েছিল। কথা বলতে তার স্পষ্টতই প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল, প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়ে তাকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছিল।

 

কিন্তু শারীরিক এই চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা তার অদম্য মানসিক শক্তিকে বিন্দুমাত্র অবদমিত করতে পারেনি। সেই ভাঙা গলাতেই তিনি উপস্থিত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে অত্যন্ত আবেগঘন এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ একটি বার্তা ছুড়ে দেন।

 

তিনি বলেন, "দিল্লিতে যখন কোনো রক্তক্ষরণ হয়, তখন তার প্রতিবাদে কলকাতা সবার আগে উঠে দাঁড়ায়; ঠিক একইভাবে কলকাতার বুক চিরে যখন রক্ত বয়, তখন দিল্লিও সমান সহমর্মিতা নিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়ায়।"

 

তার এই একটিমাত্র বাক্য যেন মুহূর্তের মধ্যে দিল্লি এবং কলকাতার ছাত্রসমাজের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের সেতু নির্মাণ করে দেয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে নেহার এই ভগ্ন কণ্ঠস্বরের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর লড়াইয়ের সদ্য সমাপ্ত অধ্যায়।

 

যাদবপুরে আসার ঠিক এক দিন আগেই ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পুলিশের এক কঠোর পদক্ষেপের শিকার হয়েছিলেন তিনি। ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা রক্ষার দাবিতে দিল্লিতে এক বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল, যার একেবারে প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন নেহা।

 

টানা দুদিন ধরে চলা এই তীব্র আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে এবং নেহা বোরাসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ ছাত্র নেতাকে আটক করে। আটকের পর তাদের ওপর যে মানসিক ও শারীরিক চাপ প্রয়োগ করা হয়, তা ছিল নজিরবিহীন।

 

রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তর থেকে আটক করে নেহাকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নারেলা নামক একটি সম্পূর্ণ অপরিচিত এবং বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় তাকে আটকে রাখার পর অবশেষে সন্ধ্যেবেলায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

 

পুলিশের এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি এবং দীর্ঘ যাত্রার ধকল তার শরীর ও কণ্ঠের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে বক্তব্য রাখার সময় নেহা তার নিজের শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে বলেন, "আমার শরীর এবং গলার বর্তমান অবস্থা ঠিক যতটা ভেঙে পড়েছে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট বা এসআরএফটিআই-এর মতো দেশের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকাঠামো ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের অবস্থাও আজ ঠিক ততটাই ভেঙে পড়েছে।"

 

তার এই রূপকধর্মী বক্তব্য উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে নিজের শারীরিক যন্ত্রণার সঙ্গে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয়কে এক সুতোয় গেঁথে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন।

 

নেহা বোরার জাতীয় স্তরে একজন প্রথম সারির প্রতিবাদী মুখ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার এই অসামান্য যাত্রার আনুষ্ঠানিক শুরুটা হয়েছিল খুব বেশি দিন আগে নয়। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক স্তরে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা 'ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট' বা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সমগ্র দেশকে আক্ষরিক অর্থেই নাড়িয়ে দিয়েছিল।

 

এই মহা কেলেঙ্কারির কারণে দেশের লক্ষ লক্ষ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে গিয়ে পড়ে। মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের এই দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এবং স্বপ্ন যখন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার কারণে ধূলিসাৎ হতে বসেছিল, তখন গোটা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

 

এই নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগের দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন নেহা।

 

নিট কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে এবং দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে দিল্লির রাজপথে যে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আমরণ অনশনে বসেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রখ্যাত সমাজসংস্কারক সোনম ওয়াংচুক এবং ছাত্রনেতা অভিজিৎ দীপকে।

 

তাদের সেই আদর্শিক লড়াইয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন নেহা বোরা। তিনি তার কয়েকজন বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সঙ্গীকে নিয়ে এই অনশন কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই আন্দোলনের একটি অত্যন্ত অভিনব এবং ব্যঙ্গাত্মক দিক ছিল 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপি নামক একটি প্রতীকী প্রতিবাদী মঞ্চের উপস্থিতি।

 

এই মঞ্চের সমর্থক হিসেবে নেহা এবং তার সঙ্গীরা অত্যন্ত সৃজনশীল উপায়ে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে ঘুণে ধরা দুর্নীতিগ্রস্ত মানসিকতা এবং রাজনৈতিক নেতাদের উদাসীনতাকে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেন।

 

তাদের এই ব্যঙ্গাত্মক অথচ অত্যন্ত ধারালো প্রতিবাদী কর্মসূচি খুব দ্রুতই জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এবং নেহা বোরা রাতারাতি সারা দেশের ছাত্র-যুব সমাজের কাছে এক প্রতিবাদী আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

 

নেহা বোরার এই রাজনৈতিক উত্থান কেবল একটি সাধারণ ছাত্র আন্দোলনের গল্প নয়; এটি ভারতের পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। একটি রক্ষণশীল এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করার পরও, তিনি নিজের স্বাধীন চিন্তা এবং যুক্তিবাদী মননের ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথ বেছে নিয়েছেন।

 

তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা আর কেবল অন্ধভাবে পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করতে প্রস্তুত নয়। তারা এখন নিজেদের চারপাশের সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হওয়ার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং তার বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে আওয়াজ তুলতে পিছপা হয় না।

 

সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর মতো একটি কট্টর বামপন্থী রাজনৈতিক দলের ছাত্র শাখার সর্বোচ্চ পদে একজন ডানপন্থী পরিবারের মেয়ের এই উত্তরণ ভারতের রাজনীতিতে এক বিরল এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

 

পুলিশি হয়রানি, শারীরিক অসুস্থতা এবং রাষ্ট্রীয় রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নেহা বোরা আজ যেভাবে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন, তা দেশের অগণিত সাধারণ শিক্ষার্থীর মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

 

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ভাঙা গলার ভাষণ থেকে শুরু করে দিল্লির যন্তর মন্তরের অনশন মঞ্চ-সবখানেই তিনি একটিই বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন যে, ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামনে যেকোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ও স্বৈরাচারী ব্যবস্থা মাথা নত করতে বাধ্য। ভারতের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে নেহা বোরার এই অকুতোভয় সংগ্রাম নিঃসন্দেহে এক নতুন এবং সোনালি অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

- বিবিসি বাংলা