মঙ্গলবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিরোধী দলগুলোর বৃহৎ রাজনৈতিক মোর্চা 'ইন্ডিয়া' জোটের উদ্যোগে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়, যা ঘিরে একপর্যায়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাজপথ।
নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা এবং ভোটার তালিকা থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের বৈধ নাগরিকদের নাম বাতিলের আশঙ্কায় বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা এদিন একযোগে রাজপথে নেমে আসেন।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিরোধীদের এই অনাস্থা এবং রাজপথের আন্দোলন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে ভারতের সংসদ ভবনের মকরদ্বারে জড়ো হতে শুরু করেন ইন্ডিয়া জোটভুক্ত ১৯টি বিরোধী দলের দেড় শতাধিক নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
তাদের এই জমায়েতের মূল লক্ষ্য ছিল সংসদ ভবন থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর ‘নির্বাচন সদন’ অভিমুখে এক বিশাল প্রতিবাদী পদযাত্রা করা। মিছিলে অংশগ্রহণকারী প্রবীণ ও নবীন নেতাদের হাতে ছিল ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ এবং ‘আমার ভোট বাঁচাও’ সংবলিত বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড।
তবে শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া এই পদযাত্রাটি বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। মিছিলটি শুরু হওয়ার পরপরই দিল্লি পুলিশের বিশাল বাহিনীর কড়া বাধার সম্মুখীন হয় তারা। নগর প্রশাসন এই বিক্ষোভ মিছিলের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রদান করেনি, যার ফলে নীতি আয়োগ এবং আকাশবাণী ভবনের মধ্যবর্তী রাস্তায় পুলিশের পক্ষ থেকে শক্তিশালী লোহার ব্যারিকেড স্থাপন করে তাদের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়।
পুলিশি বাধার মুখে পড়ে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা পিছপা না হয়ে রাজপথেই বসে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। পরিস্থিতি একপর্যায়ে চরম নাটকীয় ও উত্তেজনাকর রূপ ধারণ করে, যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশের দেওয়া ব্যারিকেডের ওপর সরাসরি উঠে পড়েন।
জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের দাবিতে শীর্ষ নেতাদের এই অনড় ও সাহসী অবস্থান পুরো এলাকায় এক অভাবনীয় উত্তেজনার জন্ম দেয়। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একপর্যায়ে রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় বিরোধী সংসদ সদস্যকে জোরপূর্বক আটক করে পুলিশের বাসে তুলে নেয়।
তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় এবং কৌশলগত কারণে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আটককৃত নেতাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় দিল্লি পুলিশ। এই উত্তেজনাকর ঘটনার পরপরই রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরাসরি উদ্দেশ করে একটি অত্যন্ত কড়া ও সংক্ষিপ্ত বার্তা প্রদান করেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লেখেন, ‘জ্ঞানেশ, সব শেষ। এবার পদত্যাগের সময় এসেছে।’ বিরোধী জোটের এই তীব্র ও ধারাবাহিক আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া, যা প্রশাসনিকভাবে 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' বা সংক্ষেপে এসআইআর নামে পরিচিত।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই এসআইআর প্রক্রিয়ার আড়ালে সুকৌশলে দেশের অসংখ্য বৈধ ও সরকারবিরোধী ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চলছে। তারা অবিলম্বে এই বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
একইসঙ্গে যেসব ভোটারের নাম ইতিমধ্যে তালিকা থেকে অন্যায়ভাবে বাদ পড়েছে, তাদের নাম অবিলম্বে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের ওপর প্রবল চাপ প্রয়োগ করছেন বিরোধীরা।
নির্বাচন কমিশনের সামগ্রিক কার্যক্রমে চরম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তারা একযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছেন। এই বিতর্কে একেবারে নতুন ও আইনি মাত্রা যোগ করেছে নতুন ভোটার হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ‘ফর্ম-৬’-এর কাঠামোগত পরিবর্তন।
ফর্ম-৬ পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়টি কেবল রাজপথের রাজনৈতিক আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি গড়িয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের এজলাস পর্যন্ত। গত সোমবার সুপ্রিম কোর্ট এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত ফর্ম-৬ কোনোভাবেই সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারা অনুমোদিত নয়।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন একটি বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীদের কাছে জানতে চেয়েছে, ঠিক কার নির্দেশে এবং কোন আইনি ক্ষমতাবলে এই ফর্মে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আদালত এই পরিবর্তনের পেছনের সমস্ত প্রশাসনিক ও প্রামাণ্য নথি দ্রুততম সময়ের মধ্যে উপস্থাপনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।
যদিও সুপ্রিম কোর্ট এই প্রাথমিক আইনি শুনানির পর্যায়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ প্রদান করেনি, তবে নির্বাচন কমিশনের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া এবং ফর্ম-৬ পরিবর্তনের নথি তলব করার এই নজিরবিহীন পদক্ষেপকে বিরোধীরা নিজেদের বড় ধরনের নৈতিক বিজয় হিসেবেই বিবেচনা করছেন।
অন্যদিকে, নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ ও অনাস্থা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। কমিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, বিরোধীদের দাবিগুলো সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ জুন ভারতের বিহার রাজ্যের এসআইআর কার্যক্রম সংক্রান্ত যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, তা ছিল কমিশনের একটি সম্পূর্ণ সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৭ মে সুপ্রিম কোর্টের এক চুড়ান্ত রায়েও কমিশনের সেই সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে বহাল রাখা হয়।
ফর্ম-৬ সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে রাহুল গান্ধীর দেওয়া বক্তব্যকে সরাসরি ‘বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়ে কমিশন আরও স্পষ্ট করেছে যে, মূল ফর্ম-৬-এর কোনো মৌলিক বা কাঠামোগত পরিবর্তন কখনোই করা হয়নি।
মূলত এসআইআর প্রক্রিয়ার সুবিধার্থে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতে একটি অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র এই ফর্মের সঙ্গে সাময়িকভাবে যুক্ত করা হয়েছিল। যে সমস্ত রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে, সেখানে অনলাইন পোর্টালের ফর্ম-৬ থেকে ওই অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রটি সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে।
ইন্ডিয়া জোটের এই বিশাল মাত্রার বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার সমগ্র নয়াদিল্লি, বিশেষ করে ভারতের সংসদ ভবন এবং নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের আশপাশের এলাকাগুলো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়।
যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে কয়েক স্তরের ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয় সমগ্র রাজধানীজুড়ে।
নিরাপত্তার সর্বোচ্চ সতর্কতার অংশ হিসেবে রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সাধারণ যান চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সাধারণ নাগরিকদের ওইসব স্পর্শকাতর এলাকা এড়িয়ে চলার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম সতর্কবার্তা জারি করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক ময়দানে যখন এমনিতেই চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রাজপথের এই সম্মুখ আন্দোলন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন আইনি বিষয়টি দেশটির জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই প্রবল রাজনৈতিক চাপ এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা নিয়ে চলমান এই বহুমুখী বিতর্ক আগামী দিনগুলোতে ভারতের গণতান্ত্রিক চর্চা ও আসন্ন নির্বাচনগুলোতে আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।