বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১, ২০২৬
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের সন্ত্রাসী ভাড়া করে তরুণীকে গণধর্ষণের অভিযোগ, স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার ৬

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম

ভারতের সন্ত্রাসী ভাড়া করে তরুণীকে গণধর্ষণের অভিযোগ, স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার ৬
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় পারিবারিক কলহ ও পরকীয়ার জের ধরে সংঘটিত এক ভয়াবহ, হৃদয়বিদারক ও বরবর অপরাধমূলক ঘটনার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

স্বামীর অন্য এক তরুণীর সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া এবং হোটেলে অবস্থান করার খবর পেয়ে চরম আক্রোশ থেকে একদল পেশাদার সন্ত্রাসী ভাড়া করে ওই তরুণীকে গণধর্ষণ ও তার স্বামীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে মারাত্মক জখম করার অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে।

 

গত সেপ্টেম্বর মাসে কেরালার ত্রিসুর জেলায় এই মর্মান্তিক ও অমানবিক ঘটনাটি ঘটলেও বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে পুরো ঘটনার বিস্তারিত ও শিউরে ওঠার মতো বিবরণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে।

 

এই ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সমগ্র কেরালা রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, উদ্বেগ ও স্তম্ভিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই মূল পরিকল্পনাকারী স্ত্রী এবং তার ভাড়াটে অপরাধী চক্রের সদস্যসহ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

 

পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, ভুক্তভোগী ওই তরুণী তার এক বিবাহিত পুরুষবন্ধুর সঙ্গে কেরালা রাজ্যের ত্রিসুর এলাকার একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। তারা দুজনে দীর্ঘদিনের পরিচিত হওয়ায় একসাথে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন।

 

তবে ঘটনাটির অন্তরালে ছিল পারিবারিক সম্পর্কের চরম টানাপোড়েন ও অনাস্থা। ওই বিবাহিত ব্যক্তির স্ত্রী বেশ কিছুদিন ধরেই তার স্বামীর চালচলন ও গতিবিধি নিয়ে গভীরভাবে সন্দেহ পোষণ করছিলেন। স্বামীর আচরণে অসঙ্গতি লক্ষ্য করে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রযুক্তির সহায়তা নেন এবং গোপনে স্বামীর মোবাইল ফোনের অবস্থান বা লোকেশন ট্র্যাকিং শুরু করেন।

 

ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমেই তিনি জানতে পারেন যে তার স্বামী কেরালার একটি নির্দিষ্ট হোটেলে ওই তরুণীর সঙ্গে অবস্থান করছেন। এতে চরম ক্ষোভ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওই নারী কোনো আইনি পথ বা পারিবারিক সমাধানের আশ্রয় না নিয়ে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ অপরাধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।

 

তিনি একটি সুসংগঠিত সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের ভাড়া করে স্বামীকে শিক্ষা দেওয়া ও তরুণীকে নির্যাতন করার নির্দেশনা দেন। স্ত্রী কর্তৃক সরবরাহকৃত সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ওই সন্ত্রাসী বাহিনী কেরালার নির্ধারিত হোটেলে অভিযান চালায়।

 

কোনো ধরনের সন্দেহ না জাগানোর জন্য অপরাধী চক্রের পাঁচজন সদস্য পুলিশের ছদ্মবেশ ধারণ করে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে হোটেলের ঘরে প্রবেশ করে। ছদ্মবেশী ওই সন্ত্রাসীরা ঘরে ঢুকেই ওই ব্যক্তি এবং তার সঙ্গে থাকা তরুণীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং একপর্যায়ে তাদের দুজনকে শক্ত দড়ি দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে।

 

এরপর তাদেরকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে নিচে নামিয়ে একটি অপেক্ষমান প্রাইভেট গাড়িতে তোলে। অপরাধীরা তাদেরকে নিয়ে প্রতিবেশী রাজ্য তামিলনাড়ুর দিকে দ্রুত গতিতে রওনা দেয়। চলন্ত গাড়ির ভেতরেই অপহৃত ব্যক্তির ওপর শুরু হয় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্মম নির্যাতন।

 

সন্ত্রাসীরা ভারী ভোঁতা অস্ত্র ও লাঠি দিয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করতে থাকে, যার ফলে ওই ব্যক্তির হাত ও পা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মারাত্মক শারীরিক যাতনায় তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে অপরাধীরা তাকে তামিলনাড়ু রাজ্যের একটি দূরবর্তী হাসপাতালের বাইরে রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে চম্পট দেয়।

 

তদন্তকারীদের বিবরণ অনুযায়ী, মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দ্বিতীয় পর্যায়ে ওই তরুণীকে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারে নির্জন স্থানে নিয়ে সন্ত্রাসীরা একে একে অসহায় ওই তরুণীর ওপর পৈশাচিক নির্যাতন ও গণধর্ষণ চালায়।

 

তরুণীটি চরম ভয়, মানসিক ট্রমা ও শারীরিক যন্ত্রণায় বার বার আকুতি জানালেও পাষণ্ড অপরাধীদের মন গলেনি। পৈশাচিক নির্যাতন শেষে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভুক্তভোগী তরুণীকে একটি ফাঁকা এলাকায় ফেলে রেখে তারা স্থান ত্যাগ করে।

 

পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় তরুণীকে উদ্ধার করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করায়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর ভুক্তভোগীদের মৌখিক জবানবন্দি ও অভিযোগের ভিত্তিতে কেরালা এবং তামিলনাড়ু রাজ্যের পুলিশ যৌথভাবে এক ব্যাপক অনুসন্ধানী তদন্ত অভিযানে নামে।

 

ঘটনার স্থান, হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ, কল ডিটেইলস রেকর্ড এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই পুরো ষড়যন্ত্রের জট খুলতে সক্ষম হয়। কেরালা রাজ্য পুলিশ জানিয়েছে যে, তারা ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা পাঁচজন পেশাদার অপরাধীকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করেছে।

 

একই সঙ্গে এই জঘন্য অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী, ওই ব্যক্তির স্ত্রীকেও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী স্বীয় অপরাধের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, স্বামীর প্রতি গভীর পারিবারিক আক্রোশ, বিশ্বাসভঙ্গ ও হিংসা থেকেই তিনি এই ভয়াবহ রূপ গ্রহণ করেছিলেন।

 

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, কোনো ধরনের বৈবাহিক বিবাদ বা মানসিক ক্ষোভের অজুহাতে এমন অমানবিক ও বরবর অপরাধ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

 

গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে অপহরণ, বেআইনি আটক, পুলিশ পরিচয়ে প্রতারণা, প্রাণঘাতী হামলা, গুরুতর অঙ্গহানি এবং গণধর্ষণের মতো কঠোর ও জামিনঅযোগ্য ধারায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত তাদের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

 

এই চাঞ্চল্যকর ও পৈশাচিক ঘটনাটি ভারতের সার্বিক নারী নিরাপত্তা এবং অপরাধ চক্রের অবাধ তৎপরতা নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একজন নারীর প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে অপর এক নারীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে গণধর্ষণের মতো চরম ঘৃণ্য অপরাধ ঘটানোর নজির আধুনিক সুশীল সমাজে অত্যন্ত বিরল ও মর্মান্তিক।

 

মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজ্ঞরা এই অপরাধকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখার তাগিদ দিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জনসাধারণকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, এই ঘটনার পেছনে আর কোনো দ্বিতীয় কোনো চক্র বা গভীর ষড়যন্ত্র জড়িত রয়েছে কিনা তা বের করতে তারা তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন।

 

দ্রুততম সময়ের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে পুলিশ গণমাধ্যমকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন নিকৃষ্ট ও জঘন্য পথ অনুসরণের দুঃসাহস না দেখায়।

 

- এনডিটিভি