একটি বিশেষায়িত মালবাহী উড়োজাহাজে করে রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে এই অতি সংবেদনশীল পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও, পথিমধ্যে পাকিস্তান তাদের নিজস্ব আকাশসীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আকস্মিক আপত্তি ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপে জ্বালানি বহনকারী উড়োজাহাজটি নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় বার্তাসংস্থা এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল বা এএনআই-এর কাছে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ফকির মাহবুব আনাম এই স্পর্শকাতর তথ্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
এই ঘটনাটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে কূটনৈতিক ও লজিস্টিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ফকির মাহবুব আনাম ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটিকে টেলিফোনে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করেন।
তিনি জানান যে, পূর্বনির্ধারিত আন্তর্জাতিক সময়সূচি ও অত্যন্ত কঠোর লজিস্টিক পরিকল্পনা অনুযায়ী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় চুল্লির জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়ামের এই বিশাল চালানটি বহনকারী রুশ কার্গো বিমান গত চব্বিশে সেপ্টেম্বর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করার কথা ছিল।
কিন্তু অত্যন্ত আকস্মিকভাবে ওই বিশেষায়িত মালবাহী বিমানটিকে আকাশসীমা ব্যবহারের অপরিহার্য আইনি অনুমতি প্রদান করা থেকে বিরত থাকে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। ঠিক কী কারণে এবং কোন ভূরাজনৈতিক বা কৌশলগত প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পাকিস্তান অত্যন্ত সংবেদনশীল এই পারমাণবিক জ্বালানি বহনকারী বেসামরিক কার্গো বিমানটিকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি, তার কোনো সুস্পষ্ট বা সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা কিংবা আনুষ্ঠানিক কারণ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হয়নি।
তবে এই অপ্রত্যাশিত বিলম্ব সত্ত্বেও প্রকল্পের কাজ যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই আকস্মিক বিলম্বের কারণে একটি নতুন ও পরিবর্তিত সময়সূচি বা লজিস্টিক শিডিউলের প্রস্তাব ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত সময়সূচি অনুযায়ী, আকাশপথের এই জটিলতা ও কূটনৈতিক বাধা নিরসন করে অথবা বিকল্প নিরাপদ আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহার করে আগামী অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই পারমাণবিক জ্বালানির এই অতি গুরুত্বপূর্ণ চালানটি নিরাপদে বাংলাদেশের মাটিতে এসে পৌঁছাতে পারে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরিবহন প্রটোকল অনুযায়ী, ইউরেনিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবহনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট ফ্লাইট রুট কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। ফলে যেকোনো দেশের আকাশসীমা ব্যবহারে আকস্মিক বাধা পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে একটি জটিল লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়, যা সমাধানে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম টেলিফোনে সংবাদমাধ্যমটিকে জানান যে, চব্বিশে সেপ্টেম্বর জ্বালানির চালানটি গ্রহণ করার জন্য ঢাকা বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ স্তরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় এবং লজিস্টিক প্রস্তুতি শতভাগ সম্পন্ন করে রাখা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা অত্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ঠিক শেষ মুহূর্তে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক শক্তি প্রতিষ্ঠান রোসাটমের দায়িত্বপ্রাপ্ত লিয়াজোঁ বা সমন্বয়কারী কর্মকর্তা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন যে, কাঙ্ক্ষিত আকাশসীমা ব্যবহারের ছাড়পত্র বা অনুমতি না পাওয়ার কারণে নির্ধারিত ফ্লাইটে পারমাণবিক জ্বালানি পাঠানো কোনোভাবেই সম্ভবপর হচ্ছে না।
তিনি আরও যোগ করেন যে, সম্ভবত একটি পরিবর্তিত, নতুন ও সম্পূর্ণ নিরাপদ সময়সূচিতে এই অত্যাবশ্যকীয় জ্বালানি অতি শিগগিরই দেশে এসে পৌঁছাবে। তবে ঠিক কোন দেশ বা কাদের আপত্তির কারণে এই আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি আটকে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে শুরুতে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ওই কর্মকর্তা।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএনআই এই ঘটনার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ ও প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি জানতে সরাসরি রোসাটম কর্তৃপক্ষের কাছে ইলেকট্রনিক বার্তা বা ই-মেইল প্রেরণ করলেও, প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত রুশ কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব বা বিবৃতি প্রদান করা হয়নি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দেশের ইতিহাসে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র পারমাণবিক জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার অন্তর্গত প্রমত্ত পদ্মা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই বিশাল প্রকল্পটি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রোসাটমের প্রত্যক্ষ কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের নিবিড় সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নির্মিত হচ্ছে।
এই আধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে তৃতীয় প্রজন্মের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন দুটি ‘ভিভিইআর-১২০০’ মডেলের শক্তিশালী রিঅ্যাক্টর বা পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হয়েছে, যার সর্বাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার সর্বোচ্চ মানদণ্ড উত্তীর্ণ।
প্রকল্পটির দুটি ইউনিটের সম্মিলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার চারশ মেগাওয়াট, যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
এর আগে, প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটের জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুতকৃত স্বল্পমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানির প্রথম ঐতিহাসিক চালানটি গত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে রাশিয়া থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়।
সেই সময় রাশিয়ার নভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্ট বা এনজিসিসিপি-তে অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা ১৬৪টি নতুন ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একটি বিশেষায়িত রুশ কার্গো উড়োজাহাজে করে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মহলের কড়া নজরদারি এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রটোকল মেনে সেই জ্বালানি গ্রহণ করেছিল বাংলাদেশ। পরবর্তীতে, তেজস্ক্রিয়তা ও বিকিরণ প্রতিরোধী অত্যন্ত সুরক্ষিত ও বিশেষায়িত কনটেইনারে করে ঢাকা থেকে পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত প্রকল্প এলাকা পর্যন্ত ওই জ্বালানি স্থানান্তর করা হয়।
এই স্থানান্তরের জন্য মহাসড়কে একটি সুরক্ষিত 'সবুজ করিডোর' বা গ্রিন করিডোর তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে সাধারণ যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। এই অতি সংবেদনশীল পরিবহন প্রক্রিয়ার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস সদস্যবৃন্দ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য সুদক্ষ সদস্যরা।
তাদের পেশাদারিত্ব ও কঠোর নজরদারিতে সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে রূপপুরে পৌঁছায় সেই জ্বালানি। গত এপ্রিল মাসে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে সফলভাবে জ্বালানি লোডিং বা স্থাপনের কাজ শুরু হয়।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব দরবারে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন যুগে সগৌরবে প্রবেশ করে। এই ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জনের মধ্য দিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পথ সম্পূর্ণভাবে সুগম হয়।
এখন দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়াম চালানটি দেশে পৌঁছানোর পর পুরো প্রকল্পের কাজ আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা। সাময়িক এই ভূরাজনৈতিক বা লজিস্টিক বাধা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করে প্রকল্পটি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবে, এমনটাই প্রত্যাশা করছে পুরো দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল।