শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে বিষাক্ত মদ পানে ১৯ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি, গ্রেপ্তার ১৯

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

ভারতে বিষাক্ত মদ পানে ১৯ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি, গ্রেপ্তার ১৯
ছবি : Collected

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মনোরম পাহাড়ি রাজ্য নাগাল্যান্ডের নিরিবিলি জনপদে সম্প্রতি এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় আঘাত হেনেছে। বিষাক্ত ও ভেজাল মদ পানের পর মারাত্মক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত কয়েক দিনে অন্তত উনিশ জন হতভাগ্য মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

 

এই মর্মান্তিক ঘটনাটি পুরো রাজ্যে গভীর শোক ও আতঙ্কের ছায়া ফেলে দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এই প্রাণহানির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজ্য পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, বেআইনিভাবে উৎপাদিত ও সরবরাহকৃত অত্যন্ত নিম্নমানের ভেজাল মদ পান করার কারণেই এই ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়ের পর নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসন। ঘটনার মূল কারণ উদ্ঘাটন এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনতে ইতিমধ্যেই ব্যাপক ধরপাকড় ও পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে উনিশ জন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

পুরো পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। ভয়াবহ এই প্রাণহানির ঘটনাটি মূলত নাগাল্যান্ডের দুটি পৃথক জেলায় সংঘটিত হয়েছে। জেলা পুলিশের দেওয়া বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মোককচুং জেলায় বিষাক্ত মদ পানের কারণে আটজন ব্যক্তির করুণ মৃত্যু হয়েছে।

 

অন্যদিকে, এর কিছুদিন আগে তুয়েনসাং জেলায় একই ধরনের বিষক্রিয়ার শিকার হয়ে আরও এগারো জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। এই দুই জেলার মৃত্যুর পরিসংখ্যান একত্রিত করেই মোট নিহতের সংখ্যা উনিশ জনে দাঁড়িয়েছে।

 

পুলিশ জানিয়েছে, মোককচুং জেলার মাঙ্গকোলেম্বা ও এর আশেপাশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সন্দেহভাজন ওই ভেজাল মদ পানের পর স্থানীয় বেশ কয়েকজন বাসিন্দা হঠাৎ করেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে নিয়ে যাওয়া হলেও তাদের মধ্যে অনেককেই শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

 

শুক্রবার পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, কেবল মোককচুং জেলাতেই মৃতের সংখ্যা আটে গিয়ে পৌঁছায়। এই ঘটনার পর পুলিশ ওই এলাকার বিভিন্ন সম্ভাব্য আস্তানায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মদ ও বিয়ার জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে।

 

এর আগে গত দশ ও এগারো সেপ্টেম্বর নাগাল্যান্ডের অপর জেলা তুয়েনসাঙেও প্রায় একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল। সেখানেও সন্দেহভাজন ভেজাল মদের বিষক্রিয়ায় এগারো জন মানুষের মৃত্যু হয়।

 

তুয়েনসাং জেলার পুলিশ প্রশাসন সেই সময়ে জানিয়েছিল যে, মৃত ব্যক্তিদের প্রায় সবাই আকস্মিক অসুস্থ হয়ে পড়ার ঠিক আগে কোনো এক অজ্ঞাত উৎস থেকে সংগ্রহ করা মদ পান করেছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, ভেজাল বা বিষাক্ত মদ পানের পর মানবদেহে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।

 

মৃত ও অসুস্থ ব্যক্তিদের শরীরেও ঠিক তেমন কিছু সুনির্দিষ্ট ও মারাত্মক উপসর্গ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসা, চোখে অন্ধকার দেখা, তীব্র ও অসহনীয় মাথাব্যথা, অস্বাভাবিকভাবে মাথা ঘোরা, প্রচণ্ড বমি বমি ভাব এবং শ্বাসপ্রশ্বাসে চরম কষ্ট হওয়ার মতো গুরুতর শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।

 

এই ধরনের উপসর্গ সাধারণত মিথানল বা অন্য কোনো মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত পানীয় গ্রহণের ফলেই দেখা দিয়ে থাকে, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ও শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে মুহূর্তের মধ্যে অকার্যকর করে দেয়।

 

তবে আধুনিক তদন্ত প্রক্রিয়ার নিয়মনীতি মেনে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে জানিয়েছে যে, কেবল উপসর্গ বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আইনত সমীচীন নয়।

 

মৃতদের শরীরে বিষক্রিয়ার প্রকৃত ধরন এবং মদে ঠিক কী ধরনের প্রাণঘাতী রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণ ছিল, তা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে নিশ্চিত করার জন্য সংগৃহীত বিভিন্ন নমুনা পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসামের গুয়াহাটিতে অবস্থিত একটি অত্যাধুনিক ফরেনসিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে।

 

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ভেজাল মদই যে মৃত্যুর শতভাগ নিশ্চিত কারণ, তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে চাইছে না প্রশাসন। তবে পুলিশি তদন্তে ইতিমধ্যে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর সূত্র তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হাতে এসেছে।

 

তদন্তের বৃহত্তর স্বার্থে এবং মূল অপরাধীদের সতর্ক হয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ না দিতে পুলিশ এই মুহূর্তে সেই সব সংবেদনশীল তথ্য গণমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করা থেকে বিরত রয়েছে। এই জঘন্য ও প্রাণঘাতী অপরাধের নেপথ্যে থাকা বিশাল সিন্ডিকেট বা চক্রটিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার লক্ষ্যে নাগাল্যান্ড পুলিশ একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্তকারী দল বা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (এআইটি) গঠন করেছে।

 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা আই বাংল্যাং চ্যাংয়ের সুযোগ্য নেতৃত্বে এই চৌকস তদন্তকারী দলটি তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। এই বিশেষ দলটির মূল লক্ষ্য ও ম্যান্ডেট হলো, কেবল মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ অনুসন্ধান করাই নয়, বরং এই সন্দেহভাজন বিষাক্ত ও ভেজাল মদের প্রাথমিক উৎস কোথায়, এটি ঠিক কোন গোপন কারখানায় বা স্থানে উৎপাদন করা হচ্ছিল, কোন পরিবহন রুট ব্যবহার করে এগুলো রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করা হচ্ছিল এবং এই অবৈধ সরবরাহের সঙ্গে স্থানীয় বা আন্তঃরাজ্য পর্যায়ের কারা কারা জড়িত রয়েছে-সেই পুরো নেটওয়ার্কটিকে চিহ্নিত করা।

 

পুলিশ আশা করছে, এই দলটির নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে খুব শিগগিরই অপরাধীদের মূল হোতাদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে।

 

নাগাল্যান্ড রাজ্যের আর্থসামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই বিষাক্ত মদের বিস্তারের বিষয়টি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। উল্লেখযোগ্য যে, নাগাল্যান্ড একটি 'ড্রাই স্টেট' বা মদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ রাজ্য।

 

১৯৮৯ সালে প্রণীত 'নাগাল্যান্ড মদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ আইন' অনুযায়ী এই রাজ্যের সীমানার ভেতরে যেকোনো ধরনের অ্যালকোহল বা মদ তৈরি, বিক্রি, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং পান করা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ।

 

এই কঠোর আইনটি ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাস থেকে রাজ্যজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর রয়েছে। কিন্তু এত কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, পর্দার আড়ালে একশ্রেণির অসাধু ও লোভী ব্যবসায়ী অবৈধ মদের এক বিশাল ও অন্ধকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।

 

বৈধভাবে মদ পাওয়ার কোনো সুযোগ না থাকায়, মদে আসক্ত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্য হয়ে বা প্ররোচিত হয়ে চোরাই পথে আসা এসব সস্তা, অনুমোদনহীন এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পানীয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

 

আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্রগুলো বেশি লাভের আশায় মদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষাক্ত স্পিরিট ও রাসায়নিক মিশিয়ে বাজারে ছাড়ে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুমিছিল দেখতে হয় সাধারণ মানুষকে।

 

বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ও সতর্কতামূলক কিছু নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন রাজ্যের সকল স্তরের মানুষকে অপরিচিত, অনুমোদনহীন, অবৈধ বা সন্দেহভাজন কোনো উৎস থেকে প্রাপ্ত যেকোনো ধরনের পানীয় গ্রহণ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকার জন্য জোরালো পরামর্শ দিয়েছে।

 

যেহেতু রাজ্যে মদের বৈধ কোনো দোকান বা উৎস নেই, তাই চোরাই পথে আসা যেকোনো পানীয়ই যে জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হতে পারে, সে বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

 

এছাড়া, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এই আহ্বানও জানানো হয়েছে যে, যদি কেউ ভুলবশত বা অসচেতনতাবশত এ ধরনের কোনো পানীয় পান করে থাকেন এবং তারপর তার শরীরে মাথা ঘোরা, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, তীব্র মাথাব্যথা বা জ্ঞান হারানোর মতো কোনো ধরনের অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, তবে বিন্দুমাত্র দেরি না করে তাকে যেন অবিলম্বে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা যেকোনো নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

 

সময়ের এক ফোঁটা অবহেলাও যে রোগীর মৃত্যু ডেকে আনতে পারে, সে বিষয়ে চিকিৎসকরাও কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। পরিশেষে, নাগাল্যান্ডের এই বিষাক্ত মদের ট্র্যাজেডি কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।

 

নিষিদ্ধকরণ আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি অবৈধ মদের চোরাচালান বন্ধে সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, সমাজের বিভিন্ন স্তরে সচেতনতা তৈরি এবং মাদকাসক্তি নিরাময়ে আরও বেশি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

 

প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টাই পারে ভবিষ্যতে এমন অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু থেকে সমাজের নিরীহ মানুষগুলোকে রক্ষা করতে। এখন দেখার বিষয়, উচ্চপর্যায়ের এই তদন্ত শেষে প্রকৃত অপরাধীরা ঠিক কতটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হয়, যা আগামী দিনে অপরাধীদের মনে ভয় ধরাতে সক্ষম হবে।