রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করল উত্তর কোরিয়া

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

জোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করল উত্তর কোরিয়া
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা ও জাতিসংঘের কড়া বিধিনিষেধকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আবারও কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করল উত্তর কোরিয়া। পূর্ব উপকূল বা জাপান সাগর লক্ষ্য করে অন্তত একটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ পরপর দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে পিয়ংইয়ং।

 

রোববার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই উদ্বেগজনক সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে আসে। নিজেদের অপরিবর্তনীয় পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে পুনরায় ঘোষণা দেওয়ার এবং পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে জাতিসংঘের সব ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার মাত্র কয়েক দিনের মাথাতেই এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঘটনাটি ঘটল, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, রোববার স্থানীয় সময় বেলা তিনটার দিকে প্রথম দফায় উত্তর কোরিয়ার ওনসান শহরের নিকটবর্তী এলাকা থেকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়।

 

এই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণস্থল থেকে প্রায় চারশত পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরত্ব অত্যন্ত সফলভাবে অতিক্রম করে জাপান সাগর নামে পরিচিত পূর্ব সাগরে গিয়ে পতিত হয়। এই প্রথম উৎক্ষেপণের রেশ কাটতে না কাটতেই এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর, সন্ধ্যা ছয়টার দিকে দ্বিতীয় আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিউলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

 

তবে এই দ্বিতীয় উৎক্ষেপণের পাল্লা বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণের পরপরই দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানায় যে, তাদের রাডার ব্যবস্থায় উত্তর কোরিয়ার ওনসান এলাকা থেকে পূর্ব সাগরের দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা হয়েছে।

 

বর্তমানে এই ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য, ধ্বংসক্ষমতা ও ধরন নির্ধারণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বিশদ বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার এই আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

 

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তাদের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক জরুরি বার্তায় উল্লেখ করেছে যে, উত্তর কোরিয়ার নিক্ষেপ করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রই ব্যালিস্টিক শ্রেণির ছিল বলে তাদের প্রাথমিক সামরিক পর্যালোচনায় ধারণা করা হচ্ছে।

 

জাপানি বার্তা সংস্থা কিয়োডো দেশটির শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বিনা প্ররোচনায় উত্তর কোরিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনায় টোকিও আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কঠোর প্রতিবাদ’ জানিয়েছে।

 

একই সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের এই পদক্ষেপকে আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য এক চরম ও অনাকাঙ্ক্ষিত হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণের খবর পাওয়ার পরপরই তাদের জাতীয় নিরাপত্তা কার্যালয় পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য একটি জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক আহ্বান করে।

 

ওই বৈঠকে রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এই উৎক্ষেপণের সম্ভাব্য বহুমুখী প্রভাব অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে পিয়ংইয়ং প্রশাসনকে অবিলম্বে সব ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধের উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে সিউল।

 

রোববারের এই জোড়া উৎক্ষেপণকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিদ্যমান প্রস্তাবের সুস্পষ্ট ও নির্লজ্জ লঙ্ঘন এবং একটি গুরুতর অপরাধমূলক আন্তর্জাতিক কাজ বলে কঠোর ভাষায় অভিহিত করেছে দক্ষিণ কোরিয়া।

 

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উত্তর কোরিয়া ক্রমাগত তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের দিকে জোর দিচ্ছে। এর আগে গত সপ্তাহেও তারা পূর্ব সাগরের দিকে একাধিক স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, সেটি ছিল তাদের সামরিক বাহিনীর একটি নিয়মিত ও যৌথ মহড়া মাত্র।

 

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও নিশ্চিত করেছিল যে, ওই বিশেষ মহড়ায় দূরপাল্লার ভারী গোলাবারুদ ও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, যা শতভাগ নির্ভুলতার সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।

 

সেই ঘটনার ঠিক আট দিন পরই আবার এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে তারা প্রমাণ করল যে, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তারা কোনো আপস করতে রাজি নয়। চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাধারণ সম্মেলনেও উত্তর কোরিয়ার এই অনড় অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায়।

 

সেখানে উত্তর কোরিয়া সরাসরি অভিযোগ উত্থাপন করে বলে যে, কিছু শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক শক্তি জোরপূর্বক তাদের বৈধ পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করার নিরন্তর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এই স্পর্শকাতর বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন, আইএইএ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার এ ধরনের কোনো প্রস্তাবই পরমাণু অস্ত্রধারী একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে উত্তর কোরিয়ার কষ্টার্জিত ও প্রতিষ্ঠিত অবস্থানের ওপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারবে না।

 

ওই মুখপাত্র আরও স্পষ্ট করে বলেন, একটি শক্তিশালী পরমাণু শক্তি হিসেবে উত্তর কোরিয়ার এই বিশেষ অবস্থান তাদের সংগঠিত ও আধুনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে সুনিশ্চিত করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এটিকে স্থায়ী ও চূড়ান্তভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের অত্যন্ত প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং এক কড়া বার্তায় বলেন, তার দেশের পরমাণু শক্তির অবস্থান সম্পূর্ণ চূড়ান্ত এবং অপরিবর্তনীয়। একই সঙ্গে যেসব আন্তর্জাতিক শক্তি বা দেশ এখনও উত্তর কোরিয়ার সম্পূর্ণ পরমাণু নিষ্ক্রিয়করণের অলীক স্বপ্ন দেখছে, তাদের তিনি চরম ‘বোকা’ বলে প্রকাশ্যেই আখ্যায়িত করেন।

 

উত্তর কোরিয়ার কাছে ঠিক কী পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানামুখী জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত আগস্ট মাসে এক বিবৃতিতে দাবি করেছিলেন যে, উত্তর কোরিয়ার মজুতে অন্তত সাতান্নটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিধ্বংসী পরমাণু অস্ত্র রয়েছে।

 

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক ও গোয়েন্দা বিভাগের দেওয়া হিসাব ও তথ্য অনুযায়ী, পিয়ংইয়ংয়ের কাছে বর্তমানে মজুত থাকা সক্রিয় পরমাণু অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা আশি থেকে একশত বিশটির মতো হতে পারে, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি এক বিশাল হুমকির ইঙ্গিত দেয়।

 

- এএফপি