শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মালদহ সীমান্ত দিয়ে ১৮ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের অপচেষ্টা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম

মালদহ সীমান্ত দিয়ে ১৮ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের অপচেষ্টা
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিকে তোয়াক্কা না করে সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়ার বা ‘পুশ-ইন’ করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ভারতের এমন বেআইনি ও একতরফা পদক্ষেপে স্বাভাবিকভাবেই গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে বাংলাদেশ।

 

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় এমন আরও একটি অমানবিক ও সন্দেহজনক ঘটনার সাক্ষী হলো সীমান্ত এলাকা, যেখানে ১৮ জন ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রাতের অন্ধকারে এ ধরনের পুশ-ইন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এসব ঘটনার নেপথ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বিশেষ নীতি কাজ করছে।

 

অভিযোগ রয়েছে যে, কেবল বাংলায় কথা বলার কারণে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের অনেক বাংলাভাষী মুসলমানকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এই রাজনৈতিক মেরুকরণের শিকার হয়ে অনেক সময় খোদ ভারতীয় নাগরিকদেরও জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে।

 

যদিও ভারতের বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও মন্ত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে, সে দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অবৈধভাবে বসবাস করছে, তবে উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের মতো রাজ্যগুলোতে বিশেষ তল্লাশি চালিয়েও এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা বড় কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

 

উল্টো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ভুয়া পরিচয়ে ভারতীয় নাগরিকদেরই রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার করে দেওয়া হচ্ছে, যার প্রমাণ অতীতেও মিলেছে। এই অমানবিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ভারতের চারটি ভিন্ন রাজ্য থেকে ১৮ জনকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার করে মালদহে নিয়ে আসা হয়েছে।

 

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ১৮ জনের মধ্যে ১৪ জনই নারী ও কিশোরী এবং বাকি চারজন পুরুষ। বিভিন্ন রাজ্য থেকে তাদের আটক করা হয়েছে; এর মধ্যে রাজস্থান থেকে দশজন, কেরালা থেকে তিনজন, তেলেঙ্গানা থেকে দুজন এবং মহারাষ্ট্র থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পুলিশ।

 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই রাজ্যগুলোর কোনোটির সঙ্গেই বাংলাদেশের সরাসরি কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত নেই। জানা গেছে, আটকের পর প্রথমে এই ১৮ জনকে রাজস্থানে জড়ো করা হয়। এরপর সেখান থেকে ট্রেনে করে হাওড়া এবং পরবর্তীতে কড়া পুলিশি পাহারায় তাদের মালদহ স্টেশনে নিয়ে আসা হয়।

 

বর্তমানে তাদের মালদহের ইংরেজবাজার সংলগ্ন একটি আটককেন্দ্রে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে এবং সেখান থেকেই তাদের বাংলাদেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর অপেক্ষায় রাখা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

 

আটকদের মধ্যে রয়েছেন রিমা, শিউলা আক্তার, সোনিয়া আক্তার, মোসাম্মাৎ রাজিয়া বেগম, তসমিয়া ইসলাম ফারিয়া, মোসাম্মাৎ মাফুজা, আলফনিনা আক্তার, রোশনে আক্তার মিম, সোনিয়া খাতুন, রুমা আক্তার, মিস স্মৃতি আক্তার, কুলসুম আক্তার, রুবিনা, আতিয়ার রহমান, মিস নাসিমা আক্তার এবং তানিয়া সাদিক শেখ।

 

মালদহ সীমান্ত ব্যবহার করে এভাবে মানুষ ফেরত পাঠানোর ঘটনা এটিই প্রথম নয়। চলতি মাসের ১ তারিখেই ভারতের বেঙ্গালুরু থেকে একইভাবে ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করে মালদহে এনে পুশ-ব্যাকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

 

ওই ১৮ জনকে নিয়ে ট্রেনটি যখন মালদহ স্টেশনে পৌঁছায়, তখন খবর পেয়ে সেখানে স্থানীয় সাংবাদিক ও চিত্রসাংবাদিকরা উপস্থিত হন। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের মতে, আটকদের মধ্যে বেশ কয়েকজন অল্পবয়সী কিশোরী ছিল এবং তাদের পোশাক ও আচরণ দেখে মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য বলেই মনে হচ্ছিল।

 

সাংবাদিকরা তাদের পরিচয় ও বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলে তারা সম্পূর্ণ নিশ্চুপ থাকে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রশাসন বা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের আগে থেকেই কথা বলতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারা অত্যন্ত শান্তভাবে পুলিশের গাড়িতে উঠে যায়।

 

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিশাল সীমান্ত রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই কোনো ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে এক দেশে প্রবেশ করে, তবে তাকে চিহ্নিত করে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সংশ্লিষ্ট সরকারের আইনি দায়িত্ব।

 

কিন্তু এক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি উঠেছে আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। যদি আটককৃত ব্যক্তিরা সত্যিই বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে থাকেন, তবে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি মেনে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেওয়াই হলো স্বীকৃত নিয়ম।

 

কিন্তু ভারতীয় প্রশাসন এখনো পর্যন্ত স্পষ্ট করেনি যে, ঠিক কোন সীমান্ত দিয়ে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাদের ফেরত পাঠানো হবে। ফলে মানবাধিকারকর্মীরা গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন যে, আগের ঘটনাগুলোর মতো এবারও হয়তো রাতের অন্ধকারে কোনো জঙ্গল বা বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে তাদের বেআইনিভাবে বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করা হতে পারে।

 

অতীতে এ ধরনের জোরপূর্বক পুশ-ব্যাকের সময় অনেক ভুক্তভোগী কান্নাকাটি করে দাবি করেছিলেন যে তারা মূলত ভারতীয় নাগরিক এবং বাংলাদেশে তাদের কোনো আত্মীয়স্বজন বা ঠিকানা নেই। পরবর্তীতে খোদ ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে এমন বেশ কয়েকজনকে দেশে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল ভারতীয় প্রশাসন।

 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারকর্মীদের জোরালো দাবি, যেহেতু আটককৃতদের বিশাল অংশই নারী ও কিশোরী, তাই ভারতের জাতীয় মহিলা কমিশনের সদস্যদের উপস্থিতিতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

 

কিন্তু সেসব আইনি ও মানবিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে, কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের স্বার্থে তাদের রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার যে বেআইনি আয়োজন চলছে, তা সচেতন মহল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।