শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীতে যুক্ত হলো প্রথম বিমানবাহী রণতরী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম

ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীতে যুক্ত হলো প্রথম বিমানবাহী রণতরী
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী মাইলফলক অর্জিত হয়েছে।

 

দেশটির অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল নৌবাহিনীর বহরে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবাহী রণতরী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপীয় রাষ্ট্র ইতালির নৌবাহিনীতে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা ৪১ বছরের পুরোনো এই সুবিশাল যুদ্ধজাহাজটি মূলত রোমের পক্ষ থেকে জাকার্তাকে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়েছে।

 

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এই রণতরীটি ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় প্রবেশ করে গন্তব্যে পৌঁছায়। ইন্দোনেশীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, নতুন এই কৌশলগত সামরিক সংযোজনের ফলে হাজার হাজার দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই বিশাল দ্বীপরাষ্ট্রটির বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক সীমানার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ আরও সহজ হবে।

 

একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্রুততম সময়ে ত্রাণ সরবরাহ ও উদ্ধার তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রে নৌবাহিনীর লজিস্টিক সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

 

ইতালির নৌবাহিনীতে অত্যন্ত সুপরিচিত ও পরীক্ষিত এই রণতরীটি এতদিন 'আইটিএস জিউসেপ্পে গারিবালদি' নামে ভূমধ্যসাগরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমুদ্রবক্ষে নিজের সদর্প উপস্থিতি ও আধিপত্য বজায় রেখেছিল।

 

প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দিক থেকে এটি এমনভাবে সুনিপুণ নকশায় তৈরি করা হয়েছে যে, এর রানওয়ে থেকে যেকোনো আধুনিক যুদ্ধবিমান অত্যন্ত স্বল্প পরিসরের জায়গা ব্যবহার করেই সফলভাবে উড্ডয়ন করতে সক্ষম।

 

পাশাপাশি, অত্যাধুনিক সামরিক হেলিকপ্টার, উদ্ধারকারী কপ্টার ও অন্যান্য যুদ্ধবিমান খুব সহজেই এর সুবিশাল ডেকে নিরাপদে অবতরণ করতে পারে, যা যুদ্ধকালীন বা জরুরি পরিস্থিতিতে দারুণ কার্যকর একটি কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে।

 

শুক্রবার সকালে রণতরীটি যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার ঐতিহাসিক তাংজুং প্রিয়োক বন্দরের সুনির্দিষ্ট নৌঘাঁটিতে এসে নোঙর করে, তখন সেখানে এক সম্মানজনক ও বর্ণাঢ্য আনুষ্ঠানিকতার সৃষ্টি হয়।

 

ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর চৌকস পদাতিক সদস্যরা সেখানে জাহাজটিকে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইতালীয় ও দেশীয় সামরিক কর্মকর্তাদের প্রতি যথাযোগ্য সামরিক সম্মান ও কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করেন।

 

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রকাশিত একটি বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসেই ইতালি সরকার তাদের এই ঐতিহাসিক, ঐতিহ্যবাহী ও পুরোনো রণতরীটি ইন্দোনেশিয়াকে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে হস্তান্তর করার বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ও নীতিগত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল।

 

আন্তর্জাতিক সামরিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, রোমের এই আপাত বদান্যতার পেছনে একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান পরাশক্তি ও ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে নিজেদের দ্বিপাক্ষিক সামরিক, কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও সম্প্রসারিত করতেই ইতালি এই সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

বর্তমানে ইতালি সরকার জাকার্তার কাছে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক সামরিক সাবমেরিন এবং বিভিন্ন পাল্লার যুদ্ধবিমান বিক্রির জন্য অত্যন্ত জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

এই উপহার সেই বাণিজ্যিক প্রসারের একটি অনানুষ্ঠানিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া এই বিশাল আকৃতির রণতরীটি বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভেঙে ফেলার বা নিষ্ক্রিয় করার জন্য ইতালির যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হতো, জাহাজটি মিত্রদেশকে উপহার হিসেবে হস্তান্তর করার ফলে রোম সেই বিশাল আর্থিক ব্যয় থেকেও নিজেদের সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করতে পেরেছে।

 

এই বিমানবাহী রণতরী হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন সমীকরণের সূচনা হলো। সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে দ্বিতীয় রাষ্ট্র হিসেবে ইন্দোনেশিয়া নিজেদের নৌবহরে এমন একটি অত্যাধুনিক ও বিশালাকার বিমানবাহী রণতরী যুক্ত করার অনন্য গৌরব অর্জন করল।

 

এর আগে, ১৯৯৭ সালে এই অঞ্চলের প্রথম দেশ হিসেবে থাইল্যান্ড ইউরোপের আরেক প্রভাবশালী দেশ স্পেনের কাছ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ রণতরী এবং এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় যুদ্ধবিমান ক্রয় করে নিজেদের সামরিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

 

দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর ইন্দোনেশিয়া সেই বিরল তালিকায় নিজেদের নাম লেখাল, যা বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, আগামী সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী এক রাষ্ট্রীয় ও জমকালো সামরিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রণতরীটিকে তাদের মূল অপারেশনাল নৌবহরে অন্তর্ভুক্ত করবে। নতুন এই যুদ্ধজাহাজটির নতুন নামকরণ করা হবে 'কেআরআই গাজাহ মাদা'।

 

ইন্দোনেশিয়ার সমৃদ্ধ ও প্রাচীন ইতিহাসে গাজাহ মাদা অত্যন্ত সুপরিচিত, প্রভাবশালী ও পরম শ্রদ্ধেয় একটি ঐতিহাসিক নাম। চতুর্দশ শতাব্দীতে রাজত্ব করা পরাক্রমশালী মাজাপাহিত সাম্রাজ্যের একজন অকুতোভয়, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী সামরিক নেতা ছিলেন তিনি।

 

ওই অঞ্চলের সমুদ্রবেষ্টিত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ছোট-বড় দ্বীপকে একত্রিত করে একটি অবিভাজ্য, শক্তিশালী ও স্বাধীন ভূখণ্ড গঠনের জন্য তিনি যে নিরলস সংগ্রাম ও ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তা আজও ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

 

তাই আধুনিক ইন্দোনেশিয়ার সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই নতুন প্রতীকটিকে সেই মহান জাতীয় বীরের প্রতি বিনম্র সম্মান জানিয়েই নামকরণ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

 

- দ্য গার্ডিয়ান