শনিবার দেশটির একটি স্বনামধন্য ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি প্রকাশ্যেই একাধিকবার ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বা ‘ফিলিস্তিন মুক্ত হোক’ বলে স্লোগান দেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এবং ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আন্তারার বরাতে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সংবাদটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ও মজলুম মানুষের প্রতি বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ার এই অবিচল সমর্থন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে।
অনুষ্ঠানে এক অভাবনীয় ও হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা হয়, যখন ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত আবদুলফাত্তাহ এ কে আল-সাত্তারি মঞ্চে উপস্থিত হয়ে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর হাতে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের ঐতিহাসিক প্রতীক একটি ‘কেফিয়েহ’ পরম শ্রদ্ধার সাথে তুলে দেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আন্তারার প্রতিবেদনে এই মুহূর্তটির বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে এই সম্মানসূচক ও আবেগজড়িত কেফিয়েহটি গ্রহণ করার পর প্রেসিডেন্ট প্রাবোও অত্যন্ত বিনম্রভাবে পুনরায় মঞ্চের সামনের দিকে এগিয়ে আসেন।
এ সময় উপস্থিত হাজারো জনতার সামনে তাকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তে দেখা যায় এবং তিনি নিজের হাতে থাকা সেই ফিলিস্তিনি কেফিয়েহ দিয়ে চোখ মুছছিলেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এমন অকৃত্রিম আবেগ ও সংহতি প্রকাশের দৃশ্য মুহূর্তেই উপস্থিত জনতার মধ্যে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।
এরপরই তিনি অত্যন্ত দৃঢ় ও উচ্চকণ্ঠে বেশ কয়েকবার ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দিয়ে পুরো অনুষ্ঠানস্থল প্রকম্পিত করে তোলেন। প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো তার সারগর্ভ ও আবেগপূর্ণ বক্তৃতায় ফিলিস্তিন সংকটের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব জাতীয় শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও ব্যাপকভাবে আলোকপাত করেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ইন্দোনেশিয়া যদি অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগতভাবে একটি ‘শক্তিশালী’ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, কেবল তখনই দেশটি বিশ্বের অন্যান্য নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থার হাতে প্রতিনিয়ত নিপীড়িত ও অত্যাচারিত হওয়া ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের কার্যকরভাবে সহায়তা করতে পারবে।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ফিলিস্তিনি নিরীহ নাগরিকদের ওপর দশকের পর দশক ধরে চলা এই নির্মম ও অমানবিক হামলা এবং তাদের সীমাহীন আত্মত্যাগ ইন্দোনেশিয়ার প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়।
ফিলিস্তিনিদের এই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম ইন্দোনেশিয়ার জন্য নিজ দেশের জাতীয় শক্তি ও ঐক্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি প্রবল অনুপ্রেরণা এবং সময়োপযোগী তাগিদ হিসেবে কাজ করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতার প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তিনি তার বক্তৃতায় এই বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে জোর দেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে একটি জাতির প্রকৃত শক্তি ও টিকে থাকার সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তার স্বনির্ভর হওয়ার ক্ষমতার ওপর।
তিনি দেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটি শক্তিশালী ও আত্মমর্যাদাশীল জাতির প্রধান ভিত্তি হলো তার স্বনির্ভরতা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইন্দোনেশিয়াকে অবশ্যই নিজস্ব বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের অত্যন্ত কার্যকর ও সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদেরকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে সুসংহত করে রাষ্ট্রকে সবদিক থেকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে।
বক্তৃতার শেষাংশে তিনি ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করেন। প্রাবোও সুবিয়ান্তো অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার অপরিহার্যতার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ইন্দোনেশিয়া যেন ভবিষ্যৎ পৃথিবীর আর কখনোই কোনো বিদেশি শক্তির উপনিবেশে বা শোষণের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে।
ফিলিস্তিনের বর্তমান পরাধীনতা ও দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে তিনি নিজ দেশের নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, আমাদের অবশ্যই ইস্পাতকঠিনভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে যেন আমরা আর কখনোই অন্য কারও উপনিবেশে পরিণত না হই। নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আমাদের অবশ্যই সব দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শক্তিশালী হতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দোনেশিয়ার সংবিধানের মূলনীতিতেই সব ধরনের উপনিবেশবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং ধর্মীয় ও মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই ইন্দোনেশিয়া ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজুড়ে সব সময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে।
প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর এই সাম্প্রতিক মন্তব্য ও আবেগপূর্ণ সংহতি প্রকাশ মূলত ইন্দোনেশিয়ার সেই দীর্ঘস্থায়ী ও পরীক্ষিত পররাষ্ট্রনীতিরই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সময়োপযোগী ধারাবাহিকতা মাত্র, যা আন্তর্জাতিক মহলে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে আরও কিছুটা বেগবান করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।