শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নারীর পেট থেকে ১৪টি কলম ও চামচসহ ২০টি বস্তু উদ্ধার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

নারীর পেট থেকে ১৪টি কলম ও চামচসহ ২০টি বস্তু উদ্ধার
ছবি: সংগৃহীত

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে মাঝে মাঝেই এমন কিছু বিরল ও বিস্ময়কর ঘটনার উদ্ভব হয়, যা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি খোদ চিকিৎসকদেরও হতবাক করে দেয়। সম্প্রতি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে এমনই এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।

 

সেখানে এক নারীর পাকস্থলী থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ১৪টি আস্ত কলম, পাঁচটি কাঠের চামচ এবং একটি মোমবাতিসহ মোট ২০টি অস্বাভাবিক বস্তু সফলভাবে বের করে এনেছেন চিকিৎসকেরা। উদ্ধারকৃত বস্তুগুলোর মধ্যে প্রায় পঁচিশ সেন্টিমিটার লম্বা একটি কলমও ছিল।

 

মানুষের পাকস্থলীতে এতগুলো অখাদ্য ও কঠিন বস্তু কীভাবে প্রবেশ করল এবং সেগুলো কীভাবে কোনো প্রাণঘাতী ক্ষতি ছাড়া ভেতরে অবস্থান করছিল, তা দেখে চিকিৎসক দল চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে এই খবরটি প্রকাশের পর তা চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

গত পাঁচই সেপ্টেম্বর অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের পালানাডু জেলার নারসারাওপেট নামক এলাকায় অবস্থিত মাতাশ্রী প্রাইভেট হাসপাতালে এই ঘটনার সূত্রপাত হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, পেটলুরিভারিপালেম গ্রামের বাসিন্দা ওই নারীকে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা এবং শারীরিক তীব্র অস্বস্তি নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার পরিবারের উদ্বিগ্ন সদস্যরা।

 

প্রাথমিক অবস্থায় রোগী বা তার স্বজনরা কেউই এই ব্যথার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি। হাসপাতালে ভর্তির পরপরই চিকিৎসকেরা তার শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য বেশ কিছু জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও স্ক্যান করার সিদ্ধান্ত নেন।

 

এসব রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে আসার পর চিকিৎসকেরা রীতিমতো চমকে ওঠেন। তারা দেখতে পান যে, ওই নারীর পাকস্থলীর ভেতরে বেশ কিছু অস্বাভাবিক ও কঠিন বস্তু বিপজ্জনকভাবে জমা হয়ে আছে, যা তার তীব্র যন্ত্রণার মূল কারণ।

 

অবস্থা বেগতিক দেখে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রখ্যাত শল্যচিকিৎসক পি রামচন্দ্র রেড্ডির নেতৃত্বে একটি অভিজ্ঞ ও দক্ষ সার্জিক্যাল দল এই জটিল অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

 

তারা রোগীর পেট না কেটে তুলনামূলক আধুনিক ও নিরাপদ ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতি অনুসরণ করে অস্ত্রোপচার শুরু করেন। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এই শ্বাসরুদ্ধকর অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা ওই নারীর পাকস্থলী থেকে একে একে সবগুলো বস্তু বের করে আনতে সক্ষম হন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত একটি ভিডিও ফুটেজে অস্ত্রোপচারের পর বের করে আনা কলম ও কাঠের চামচসহ অন্যান্য বস্তুগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়। চিকিৎসক দলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া বস্তুগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি কলম ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত।

 

এর মধ্যে সবচেয়ে লম্বা কলমটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় পঁচিশ সেন্টিমিটার, যা গলাধঃকরণ করা কোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। তবে চিকিৎসকদের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় ছিল কলমের ঢাকনাগুলো। উদ্ধারকৃত কলমগুলোর কোনোটির মুখেই ঢাকনা পাওয়া যায়নি।

 

চিকিৎসকদের ধারণা, ঢাকনা ছাড়া এসব ধারালো প্লাস্টিকের অংশগুলো ওই নারীর শরীরের ভেতরের সংবেদনশীল অঙ্গে বা অন্ত্রে বড় ধরনের আঘাত বা রক্তক্ষরণের মতো মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করার প্রবল ঝুঁকি সৃষ্টি করেছিল। তবে সৌভাগ্যবশত, তেমন কোনো স্থায়ী ও বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ক্ষতি হওয়ার আগেই বস্তুগুলো অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে।

 

প্রধান সার্জন পি রামচন্দ্র রেড্ডি গণমাধ্যমের কাছে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ কীভাবে এতগুলো কঠিন ও দীর্ঘ বস্তু গিলে ফেলতে সক্ষম হলেন এবং সেগুলো শ্বাসনালিতে না আটকে সরাসরি পাকস্থলীতে গিয়ে পৌঁছাল, তা শারীরবৃত্তীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

 

এই অস্বাভাবিক আচরণের পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায় এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও সংবেদনশীল তথ্য। ওই নারীর বয়োজ্যেষ্ঠ বাবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংবাদমাধ্যমের কাছে তার মেয়ের জীবনের একটি বিষাদময় অধ্যায় তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান যে, তার মেয়ে গত প্রায় দশ বছর ধরে গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। এই দীর্ঘ মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যেই তার ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে আরও একটি বড় বিপর্যয়।

 

মাত্র দুই মাস আগে তার স্বামী তাকে তালাক দিয়ে চিরতরে চলে যান। বিবাহবিচ্ছেদের এই আকস্মিক ও প্রচণ্ড মানসিক আঘাত তার আগে থেকেই ভঙ্গুর মানসিক স্বাস্থ্যকে আরও চরম অবনতির দিকে ঠেলে দেয়।

 

চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, দীর্ঘদিনের মানসিক অবসাদ এবং সাম্প্রতিক বিবাহবিচ্ছেদের তীব্র মানসিক ট্রমা থেকেই তিনি সম্পূর্ণ অবচেতনভাবে বা অস্বাভাবিক মানসিক তাড়না থেকে কলম, কাঠের চামচ ও মোমবাতির মতো অখাদ্য বস্তুগুলো গিলে ফেলেছিলেন।

 

বর্তমানে ওই নারীর সফল অস্ত্রোপচার শেষে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকেরা আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, এত বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি অস্ত্রোপচারের পরও অত্যন্ত স্বস্তির বিষয় হলো, রোগীর শারীরিক অবস্থা বর্তমানে সম্পূর্ণ স্থিতিশীল রয়েছে।

 

তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন এবং হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্সদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি তাকে দ্রুত মানসিক ট্রমা থেকে বের করে আনতে ভবিষ্যতে তাকে উন্নত মানসিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। এই ঘটনাটি মানবদেহের সহ্যক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সমাজকে আরও বেশি যত্নশীল হওয়ার একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়ে গেল।

 

- জিও নিউজ