মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ইনশাআল্লাহ’ বলায় পশ্চিমবঙ্গে আইপিএস কর্মকর্তাকে দ্রুত বদলি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম

‘ইনশাআল্লাহ’ বলায় পশ্চিমবঙ্গে আইপিএস কর্মকর্তাকে দ্রুত বদলি
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি অনুপ্রেরণামূলক ভিডিওতে নির্দিষ্ট কিছু ইসলামি পরিভাষা ব্যবহারের জেরে চরম বিতর্কের মুখে পড়েছেন একজন শীর্ষস্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা।

 

এই ঘটনার পরপরই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের পদ থেকে আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানুকে বদলি করেছে রাজ্য সরকার। ২০২১ ব্যাচের পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের এই প্রতিভাবান নারী কর্মকর্তাকে সর্বশেষ প্রশাসনিক নির্দেশিকায় রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের চতুর্থ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমান্ড্যান্ট পদে বদলি করা হয়েছে।

 

সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আকস্মিক বদলিকে নিছক ‘জনস্বার্থে’ নেওয়া একটি নিয়মিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, একটি কট্টরপন্থি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই সরকারের এই ত্বরিত পদক্ষেপ রাজ্যটির প্রশাসনিক, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনা এবং নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

প্রশাসনিক ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সিভিল সার্ভিস বা ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করেন আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানু।

 

মূলত সিভিল সার্ভিসে আসতে ইচ্ছুক তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগানোর লক্ষ্যেই তিনি ওই ভিডিওটি তৈরি করেছিলেন। সেখানে তিনি নিজের শিক্ষাজীবন, দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং সিভিল সার্ভিসের মতো কঠিন পরীক্ষায় সফল হওয়ার পেছনে নিজের সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

 

এই সাফল্যের যাত্রার কথা বলতে গিয়ে তিনি ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রেসিডেন্সিয়াল কোচিং একাডেমি’র অবদানের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

 

সেই ভিডিও বার্তার সাবলীল কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত ‘আসসালামু আলাইকুম’, ‘ইনশাআল্লাহ’ এবং ‘জাযাকাল্লাহ’র মতো কিছু আরবি শব্দ ব্যবহার করেন।

 

মূলত সাধারণ শিষ্টাচার হিসেবে ব্যবহৃত এই শব্দগুলোর কারণেই তাকে নিয়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত বিতর্কের সূত্রপাত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ‘হিন্দু লিগাল ফান্ড’ নামের একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক ও লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।

 

ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় দাবি করা হয় যে, সরকারের একজন দায়িত্বশীল এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে বুশরা বানু তার ওই জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যে ধর্মীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

 

তাদের দায়ের করা ওই অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ওই পুলিশ কর্মকর্তা তার অনুপ্রেরণামূলক বার্তায় ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘জয় হিন্দ’-এর মতো ভারতের বহুল প্রচলিত ও সর্বজনীন জাতীয়তাবাদী সম্বোধনগুলো সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন।

 

বিস্ময়কর ও লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক দপ্তরে এই অভিযোগ জমা পড়ার ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ ১৪ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ওই কর্মকর্তাকে তার বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি করা হয়।

 

এই বিতর্কিত নির্দেশিকার মাধ্যমে শূন্য হওয়া পদে খড়গপুরের নতুন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে রাজ্য পুলিশ সেবার কর্মকর্তা পার্থ ঘোষকে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সরকারি নির্দেশিকায় সুভেন্দু মণ্ডল নামের আরও একজন পুলিশ কর্মকর্তাকেও তার দায়িত্ব থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

 

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরো বিষয়টিকে একটি নিয়মিত, রুটিনমাফিক ও সাধারণ প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। সরকারের দাবি, পুলিশ প্রশাসনে এ ধরনের বদলি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

 

তবে, একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের হওয়ার ঠিক পরপরই এমন অভাবনীয় দ্রুতগতিতে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ওয়াকিবহাল মহল ও মানবাধিকার কর্মীরা সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলছেন।

 

বিভিন্ন স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, সাম্প্রতিক সময়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখেই রাজ্য সরকার বাধ্য হয়ে এত দ্রুত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, যেখানে সকল নাগরিকের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি পালনের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে, সেখানে প্রশাসনিক পদে থাকা একজন কর্মকর্তার মুখের ভাষার কারণে এমন শাস্তিমূলক বা ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ একটি বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোও এই ঘটনাকে ভারতের বর্তমান অসাম্প্রদায়িক প্রশাসনিক কাঠামোর একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভারতের সরকারি চাকরিতে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রভাব এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে এক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিতর্কের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

 

- টাইমস অব ইন্ডিয়া