এই দুই চিরবৈরী অথচ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সমানতালে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বৈশ্বিক পরাশক্তি ও নিজেদের অন্যতম প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সন্তুষ্টি ধরে রাখা ভারতের জন্য এক চরম ও জটিল কূটনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও থিংক ট্যাংক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ বা ওআরএফ-এর পরিচালক এবং প্রখ্যাত ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক হর্ষ পন্ত সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই বহুমাত্রিক সংকটের বিষয়ে গভীর আলোকপাত করেছেন।
তাঁর মতে, ইরান ও তার অন্যান্য আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের নানামুখী এবং সাংঘর্ষিক প্রত্যাশার মধ্যে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে চলার পাশাপাশি পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রাখার এই নিরন্তর প্রচেষ্টা ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে অন্যতম কঠিন এক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রভাবশালী জোট ব্রিকসের বর্তমান অবস্থাকে এই সংকটের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে টানা যায়। চলতি বছরের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকের দৃশ্যমান ব্যর্থতার বিষয়টি উল্লেখ করে হর্ষ পন্ত বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহ জটিলতা তুলে ধরেন।
তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমটিকে জানান, ওই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতাদর্শগত ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের তীব্র সংঘাতের কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো সর্বসম্মত চূড়ান্ত দলিল বা যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক ব্যর্থতার পেছনে নবাগত সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মতো মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যকার ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের সুস্পষ্ট নেতিবাচক প্রভাব এখন ব্রিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বহুজাতিক জোটের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও অত্যন্ত গভীরভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে, যা জোটটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
বর্তমান এই অস্থিতিশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভারতকে চলতি বছর এক অত্যন্ত কঠিন ও বন্ধুর কূটনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হবে বলে সতর্ক করেছেন হর্ষ পন্ত। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রমাণ দিতে ভারত এই চরম সংকটের মধ্যেও একটি গঠনমূলক ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে।
বিশেষ করে, যেসব মৌলিক ও সর্বজনীন বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ, অন্তত সেসব বিষয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে একটি অভিন্ন মতাদর্শে বা প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য নয়াদিল্লি তার সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করবে।
কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত-উভয় দেশই ব্রিকসের যেকোনো চূড়ান্ত দলিলে বা আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্রে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের সর্বোচ্চ এবং নিরঙ্কুশ প্রতিফলন দেখতে বদ্ধপরিকর।
দেশ দুটির এই আপসহীন ও অনড় অবস্থানের কারণে একটি সর্বসম্মত ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য দলিলে পৌঁছানো ব্রিকস জোটের জন্য বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই চরম কূটনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধানে কেবল ভারত একা নয়, বরং জোটের অন্যান্য প্রভাবশালী ও পরাশক্তি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকার কথাও গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এই প্রখ্যাত বিশ্লেষক।
হর্ষ পন্ত মনে করেন, ব্রিকসের অন্যতম প্রধান দুই চালিকাশক্তি রাশিয়া ও চীনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য রাষ্ট্রগুলোও উদ্ভূত এই চরম জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বিবদমান দুই পক্ষকে একটি সম্মানজনক ও টেকসই সমঝোতায় আনতে পর্দার আড়ালে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাবে।
কারণ, এই বিষয়টি এখন আর কেবল একটি যৌথ বিবৃতি বা সাধারণ ঘোষণাপত্র তৈরির আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর সঙ্গে ব্রিকসের মতো একটি বৃহৎ বৈশ্বিক জোটের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা ও সুনামের প্রশ্ন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে হর্ষ পন্ত ব্রিকসের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, ব্রিকস জোট যদি তার সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও স্বার্থের সংঘাত মিটিয়ে একটি সর্বসম্মত ও অভিন্ন দলিল গ্রহণে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হতে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে-বিশেষ করে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বিশাল অংশের কাছে-এই সংগঠনটিকে একটি সম্পূর্ণ অকার্যকর, সিদ্ধান্তহীন ও দুর্বল প্ল্যাটফর্ম বলে মনে হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ ঐক্যের এই চরম অভাব আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্রিকসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যা মূলত পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা এই জোটের মূল উদ্দেশ্যকেই এক বিশাল প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে।