মঙ্গলবার দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বহুল আলোচিত এই সম্ভাব্য সফরের অগ্রগতি সম্পর্কে গণমাধ্যমকে জানানোর মতো কোনো হালনাগাদ বার্তা এই মুহূর্তে তাঁদের কাছে নেই।
নয়াদিল্লিতে গুরুত্বপূর্ণ এই ব্রিকস সম্মেলন শুরু হতে আর মাত্র চার দিন বাকি থাকলেও শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক তৎপরতা ঘিরে এখনো ধোঁয়াশা বিরাজ করছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
তবে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, সরকারপ্রধানের নয়াদিল্লি সফরের ক্ষেত্রে এখনো আরও অনুকূল এবং ইতিবাচক কূটনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। ফলে সম্মেলন শুরুর ঠিক প্রাক্কালে উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই সম্ভাব্য যোগাযোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর পর্যবেক্ষণ তৈরি হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ ভারতে তারেক রহমানের প্রথম সফর চূড়ান্ত করতে দুই দেশের কূটনীতিকরা কয়েক সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার সম্পর্কে দৃশ্যমান এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল।
সেই কূটনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্বকে নতুন বাস্তবতায় কার্যকরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই মূলত এই নেপথ্য আলোচনা শুরু হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন এবং বর্তমানে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার লক্ষ্যে ঢাকার পক্ষ থেকে বারবার আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানো হয়েছে।
তবে প্রত্যর্পণের এই সংবেদনশীল আবেদনের বিষয়ে ভারত এখনো আইনি ও প্রক্রিয়াগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে বলেই অব্যাহতভাবে জানিয়ে আসছে। ফলে এই অমীমাংসিত বিষয়টি দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি স্পর্শকাতর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
এদিকে সম্প্রতি ঢাকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর মধ্যকার এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই দ্বিপাক্ষিক সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন সম্মেলনে অংশগ্রহণ কিংবা শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আলোচনা হয়েছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বিষয়টি স্পষ্ট করেন।
তিনি জানান, বৈঠকটি মূলত একটি আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল। সেখানে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিত, দ্বিপাক্ষিক অগ্রাধিকার, জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক মেলবন্ধন এবং আগামী দিনগুলোতে এই সম্পর্ককে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
নির্ধারিত এই বৈঠকে সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের ওপরই আলোকপাত করা হয়েছিল। অন্যদিকে বিগত দুই বছর ধরে স্থগিত থাকা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবা আগামী অক্টোবর মাস থেকে পুনরায় চালুর সম্ভাবনা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়েও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
তবে যোগাযোগ খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের বিষয়েও মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান যে, ট্রেন চলাচল শুরু করার সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ বা রূপরেখা সম্পর্কিত কোনো হালনাগাদ তথ্য তাঁর কাছে নেই।
সামগ্রিকভাবে, নতুন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন ও সহযোগিতার নতুন পথ তৈরির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও, উচ্চপর্যায়ের সফর ও নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো এখনো অতি সতর্ক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে।