মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন প্রেসিডেন্টকেও ছাড়িয়ে গেলেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী, তারপরও বাড়ছে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্টকেও ছাড়িয়ে গেলেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী, তারপরও বাড়ছে
ছবি : Collected

বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর নেতাদের বেতন কাঠামোকে পেছনে ফেলে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে সিঙ্গাপুর। দেশটির ক্ষমতাসীন সরকার মন্ত্রিসভার সদস্য এবং শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর এক নতুন ঘোষণা দিয়েছে।

 

এর ফলে ইতিমধ্যে বিশ্বের সর্বাধিক বেতনভুক রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের আয় আরও একধাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং চাকরির বাজারের বর্তমান সংকটের মাঝে সরকারের এই উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স এবং বিবিসি-র অনুসরণে প্রফেশনাল ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, মেধাবী নেতৃত্ব আকর্ষণের যুক্তি দেখানো হলেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এই পদক্ষেপে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।

 

ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের বার্ষিক বেতন প্যাকেজে ১৪ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলার বা প্রায় ১১ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ বৃদ্ধি পাবে। তবে জনসমালোচনার বিষয়টি মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী ওং ঘোষণা দিয়েছেন যে, আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত তার এই বর্ধিত বেতনের পুরো অংশটি তিনি বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করে দেবেন।

 

এই বিশাল অঙ্কের বেতন বৃদ্ধির ফলে তিনি বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজের শীর্ষ অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করলেন। নতুন এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার আগে থেকেই তিনি বার্ষিক ২২ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলার বেতন নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

 

নতুন বেতন কাঠামোয় তার আয় ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে সরাসরি ৩৬ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলারে উন্নীত হবে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক নেতাদের আয়ের তুলনামূলক চিত্রে তার ধারেকাছেও কেউ নেই। বর্তমান বিশ্বনেতাদের তালিকায় এরপরই রয়েছেন হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী জন লি, যিনি বার্ষিক প্রায় ৭ লাখ ১৯ হাজার ডলার বেতন পান।

 

এছাড়া সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিনের বার্ষিক বেতন ৬ লাখ ৬ হাজার ডলার, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পান ৪ লাখ ডলার এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পান ২ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আন্তর্জাতিক এই ব্যবধানটি স্পষ্ট করে দেয় যে সিঙ্গাপুরের শীর্ষ রাজনৈতিক নির্বাহীদের বেতন বিশ্বের অন্যান্য প্রধান অর্থনীতির দেশের তুলনায় কতটা আকাশচুম্বী।

 

বেতন বাড়ানোর এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তকে যৌক্তিকতা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন যে, দেশের বিভিন্ন করপোরেট খাতের শীর্ষ মেধাবী এবং সফল পেশাজীবীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার জন্য মন্ত্রীদের এই উচ্চ বেতন দেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল।

 

সিঙ্গাপুর সরকারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত নীতি হলো, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের আকর্ষণীয় বেতন প্রদান করা হলে তা প্রশাসনিক পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে শক্তিশালী প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।

 

তবে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, সাধারণ মানুষের চাকরির অনিশ্চয়তা এবং আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে সাধারণ নাগরিকরা যখন চরম চাপের মুখে দিন কাটাচ্ছেন, তখন সরকারের এই পদক্ষেপ ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়েছে।

 

সরকার এই যুক্তি দেখালেও বিরোধীরা বলছেন যে, দেশের বেশিরভাগ সাধারণ নাগরিক মাস শেষে যে গড় আয় করেন, মন্ত্রীদের প্রস্তাবিত বেতন তার তুলনায় বহু গুণে বেশি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের সাধারণ নাগরিকদের মাসিক গড় আয়ের পরিমাণ ৫ হাজার ৭৭৫ সিঙ্গাপুরি ডলার, যা সরকারের শীর্ষ কর্তাদের বেতনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।

 

বেতন বৃদ্ধির এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওং আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে বেসরকারি খাতের সফল ব্যবসায়িক নেতৃত্ব বা শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য রাজি করানো অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি খাতের সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করা সম্ভব না হলেও, যোগ্য ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে আসার ক্ষেত্রে আর্থিক নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই বড় ধরনের বাধা হিসেবে দাঁড় করাতে চায় না বর্তমান প্রশাসন।

 

তিনি জোরালোভাবে বিশ্বাস করেন যে, এই প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো তাকে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের যোগ্য সিঙ্গাপুরি নেতাদের দেশের সেবায় এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করবে এবং দেশের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দক্ষ রাজনৈতিক দল গঠন করার পথ সুগম করবে।

 

নতুন এই নীতিমালার আওতায় বর্তমানে মন্ত্রীদের মূল বেতন প্যাকেজ প্রায় ১১ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১২ লাখ সিঙ্গাপুরি ডলারে পৌঁছাবে। তাছাড়া সরকারের বর্তমান মেয়াদের শেষ নাগাদ মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যের বেতন ১৩ লাখ ৫০ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলারে গিয়ে ঠেকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা তাদের নিজ নিজ দপ্তরের দক্ষতা ও কর্মক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে।

 

সিঙ্গাপুরের মন্ত্রীদের এই বিলাসবহুল বেতন ব্যবস্থা দেশটির দীর্ঘকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল পিপলস অ্যাকশন পার্টির জন্য অতীতেও বড় রাজনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকেই নিরঙ্কুশভাবে দেশ পরিচালনা করে আসা এই দলটিকে ২০১১ সালের একটি ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে ভোটারদের চরম অসন্তোষের মুখে পড়তে হয়েছিল।

 

সে সময় মন্ত্রীদের উচ্চ বেতন এবং অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, যার ফলে দলটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছিল। জনগণের সেই ক্ষোভের মুখে পড়ে পরের বছরই সরকার বাধ্য হয়ে মন্ত্রীদের বেতন কিছুটা কমিয়েছিল।

 

এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের পূর্বসূরি ও দীর্ঘকালীন নেতা লি সিএন লুং-ও ২০০৭ সালে তৎকালীন সময়ে তার বর্ধিত বেতন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করার একই ধরনের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

 

এত কিছুর পরও সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এই উচ্চ বেতন কাঠামোই সিঙ্গাপুরকে বিশ্বমানের দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে সবচেয়ে বড় সহায়তা করেছে। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক দুর্নীতি ধারণা সূচকে সিঙ্গাপুর ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

 

তবে রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিকতা এবং সাধারণ নাগরিকদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার এই চিরন্তন দ্বন্দ্বের মাঝে দাঁড়িয়ে সিঙ্গাপুর সরকারের এই নতুন বেতন বৃদ্ধির নীতি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

 

- বিবিসি