মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দক্ষিণ কোরিয়ায় বিয়ের অনুষ্ঠানে ভিন্ন রীতির কারণে চরম বিব্রত ভারতীয় নারী!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

দক্ষিণ কোরিয়ায় বিয়ের অনুষ্ঠানে ভিন্ন রীতির কারণে চরম বিব্রত ভারতীয় নারী!
ছবি : Collected

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ভিন্ন দেশের সাংস্কৃতিক রীতিনীতি এবং সামাজিক প্রথার সঙ্গে পূর্বপরিচয় না থাকলে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। পেশাগত কারণে ভিনদেশে বসবাসকারী প্রবাসীদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটে থাকে।

 

সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ঠিক এমনই এক অস্বস্তিকর অথচ কৌতূহলোদ্দীপক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন দেশটিতে কর্মরত এক ভারতীয় নারী এবং তাঁর কয়েকজন সহকর্মী।

 

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ঐতিহ্যবাহী বিয়ের প্রথার সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির বিয়ের রীতির বিস্তর ফারাক থাকায় মূলত এই ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে এই ঘটনাটি ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যকার সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি চমৎকার উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।

 

জানা গেছে, 'জিজ্ঞাসা' নামের ওই ভারতীয় নারী পেশাগত কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি গবেষণাগার বা ল্যাবরেটরিতে বেশ কিছুদিন ধরে কাজ করছেন। প্রাত্যহিক কাজের সুবাদে স্থানীয় এক সহকর্মীর সঙ্গে তাঁর চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

 

সম্প্রতি সেই কোরীয় সহকর্মীর বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রিত হন। প্রবাসী জীবনে এটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম কোনো কোরীয় বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা।

 

অনুষ্ঠানে তিনি একা যাননি, বরং তাঁর সঙ্গে ওই একই গবেষণাগারে কর্মরত অন্যান্য ভারতীয় এবং শ্রীলঙ্কান সহকর্মীরাও যোগ দিয়েছিলেন। ভিনদেশি এক সহকর্মীর জীবনের বিশেষ এই দিনটি উদযাপনের উদ্দেশ্যে তাঁরা সবাই বেশ আনন্দঘন পরিবেশেই যথাসময়ে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন।

 

দক্ষিণ এশিয়ার প্রথা অনুযায়ী নবদম্পতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ উপহার হিসেবে তাঁরা নির্ধারিত নগদ অর্থও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন, যাতে বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁরা সেটি সরাসরি দম্পতির হাতে তুলে দিতে পারেন।

 

তবে বিয়ের মূল পর্ব শেষ হওয়ার পর যখন সবাই খাবার গ্রহণের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত ডাইনিং হলের দিকে এগোচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বাধে বিপত্তি। জিজ্ঞাসা এবং তাঁর সহকর্মীরা অন্যান্য স্থানীয় অতিথিদের অনুসরণ করে খাবার হলের প্রবেশদ্বারে পৌঁছালে সেখানকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক কর্মী তাঁদের পথ আটকে দাঁড়ান।

 

ওই রক্ষী তাঁদের কাছে খাবার হলে প্রবেশের জন্য পূর্বনির্ধারিত একটি 'টোকেন' বা প্রবেশপত্র দেখতে চান। টোকেনের কথা শুনে ভিনদেশি এই অতিথিরা সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে যান, কারণ এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের কথা তাঁদের একেবারেই জানা ছিল না।

 

পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন দেখা যায় যে, ওই নিরাপত্তারক্ষী ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে বা বুঝতে পারছিলেন না। ফলে টোকেনটি আসলে কী, কেন এটি প্রয়োজন বা কোথা থেকে এটি সংগ্রহ করতে হবে, তা তিনি ভিনদেশি এই অতিথিদের কোনোভাবেই বুঝিয়ে উঠতে পারছিলেন না।

 

মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং ব্যবহারিক প্রথা মেনে চলা হয়, যা ভারত বা শ্রীলঙ্কার মতো দক্ষিণ এশিয়ার রীতির চেয়ে একেবারেই আলাদা। দেশটিতে নিয়ম হলো, আমন্ত্রিত অতিথিদের অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের পরপরই নির্ধারিত একটি অভ্যর্থনা ডেস্কে গিয়ে নবদম্পতির জন্য আনা উপহার বা আর্থিক অনুদান একটি খামে করে জমা দিতে হয়।

 

এই উপহার জমা দেওয়ার প্রমাণস্বরূপ অতিথিদের একটি নির্দিষ্ট টোকেন বা কুপন প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে খাবার হলে প্রবেশের সময় সেই টোকেনটি নিরাপত্তারক্ষীকে প্রদর্শন করতে হয়। টোকেন ছাড়া কোনো অতিথিকেই খাবার গ্রহণ করতে দেওয়া হয় না, যা আয়োজকদের জন্য অতিথিদের আপ্যায়ন ব্যবস্থাপনা অনেকটাই সহজ করে তোলে।

 

অন্যদিকে, ভারত বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে বিয়ের প্রথা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি অনানুষ্ঠানিক। সেখানে অতিথিরা সাধারণত খাবার গ্রহণের পর অথবা নবদম্পতির সঙ্গে মূল মঞ্চে সাক্ষাতের সময় সরাসরি তাঁদের হাতে উপহার বা অর্থ তুলে দিয়ে থাকেন।

 

প্রথার এই বিশাল এবং কাঠামোগত পার্থক্যের কারণেই জিজ্ঞাসা এবং তাঁর সহকর্মীদের অনুষ্ঠানস্থলের প্রবেশদ্বারে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে চরম অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। অবশেষে এই বিব্রতকর অবস্থার অবসান ঘটে খোদ বিয়ের আয়োজকের সময়োচিত হস্তক্ষেপে।

 

যার বিয়ে হচ্ছিল, সেই কোরীয় সহকর্মী দূর থেকে বিষয়টি খেয়াল করেন এবং দ্রুত প্রবেশদ্বারে ছুটে আসেন। তিনি নিরাপত্তারক্ষীকে বিস্তারিত বুঝিয়ে বলেন যে, এই অতিথিরা বিদেশি এবং তাঁরা দক্ষিণ কোরিয়ার বিয়ের এই বিশেষ টোকেন প্রথা সম্পর্কে একেবারেই অবগত নন।

 

তাঁর এই আন্তরিক সহায়তায় ভারতীয় ও শ্রীলঙ্কান অতিথিরা সেই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পান এবং সসম্মানে খাবার হলে প্রবেশের সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তীতে জিজ্ঞাসা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে এই পুরো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় বর্ণনা করেন কীভাবে একটি দেশের সাধারণ প্রথা না জানার কারণে তাঁদের এমন বিব্রতকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন যে, ভারতে সাধারণত বিয়ের দাওয়াত খাওয়ার পর মানুষ আনন্দ উল্লাসের সঙ্গে উপহার ও অর্থ দিয়ে থাকে।

 

কিন্তু কোরিয়াতে খাবার খাওয়ার আগেই অর্থ দিয়ে টোকেন সংগ্রহ করার এই যান্ত্রিক বিষয়টি তাঁর কাছে অত্যন্ত অদ্ভুত ও অভাবনীয় বলে মনে হয়েছে। তাঁর এই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং প্রবাস জীবনে ভিন্ন সংস্কৃতির রীতিনীতি আগে থেকে জেনে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে সচেতনতা তৈরি করেছে।

 

- এনডিটিভি