মুখ্যমন্ত্রীর ‘ভাঙা চোয়াল’ নিয়ে বিজয়ের এই প্রকাশ্য কটাক্ষের জেরে বিধানসভায় তুমুল হট্টগোল সৃষ্টি হয় এবং একপর্যায়ে মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনের নেতৃত্বে শাসক দলের বিধায়করা ক্ষুব্ধ হয়ে অধিবেশন কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন।
এই ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক মহলে, বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আইনসভায় রাজনৈতিক সমালোচনার ভাষা ও ভঙ্গি নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।
সোমবার রাজ্য বিধানসভার অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় বিজয় ডিএমকে সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় আক্রমণ শানান। দলটির বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ উত্থাপন করেন তিনি।
বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার নথিপত্রের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন এবং তাঁর ছেলে উদয়নিধি স্ট্যালিনকে নিশানা করেন। দলীয় তহবিল সংগ্রহের নামে ক্ষমতাসীন দলটি কীভাবে অনৈতিক উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করে আসছিল, সে বিষয়েও তিনি দীর্ঘ অভিযোগ তুলে ধরেন।
বিরোধী দলের অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিতে এই ঘটনা ঘটলে বিধানসভার স্পিকার পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর এই রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়েও বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তাঁর একটি শারীরিক অঙ্গভঙ্গি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনকে নিয়ে কথা বলার সময় বিজয় হঠাৎ তাঁর ডান হাতের তালু নিজের চোয়ালের কাছে নিয়ে যান।
বিরোধীদের এবং শাসক দলের অভিযোগ, এই নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তিনি মূলত স্ট্যালিনের ভাঙা চোয়ালকে ইঙ্গিত করে তাঁকে চূড়ান্তভাবে বিদ্রুপ করেছেন। এই অশালীন আচরণের প্রতিবাদস্বরূপই শাসক দলের সদস্যরা একযোগে ওয়াকআউট করেন।
এম কে স্ট্যালিনের এই ভাঙা চোয়ালের পেছনের ইতিহাস নিছক কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতে যখন জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল, তখন গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে যারা রাজপথে নেমেছিলেন, স্ট্যালিন ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
সেই উত্তাল সময়ে স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি মারাত্মক পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। সেই নির্মম প্রহার এবং অকথ্য নির্যাতনের কারণেই তাঁর চোয়ালের হাড় ভেঙে যায়, যার ছাপ তাঁর চেহারায় আজও রয়ে গেছে।
ফলে তাঁর এই শারীরিক অবস্থাকে কেবল একটি দুর্বলতা হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবেই দেখেন তাঁর অনুসারী ও রাজনৈতিক মিত্ররা। সেই ঐতিহাসিক ত্যাগকে উপহাস করার কারণেই বিজয়ের আচরণকে অত্যন্ত অসংবেদনশীল ও শিষ্টাচারবহির্ভূত বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী) বা সিপিএম-এর শীর্ষস্থানীয় নেতা পি শানমুগাম। তিনি বিজয়ের এই আচরণকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন।
শানমুগাম তাঁর প্রতিক্রিয়ায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, জরুরি অবস্থার সময় গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে অংশ নিয়ে স্ট্যালিন যে নির্মম দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিলেন, তা দেশের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের এক গৌরবময় অধ্যায়।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা বা তীব্র বিরোধিতা যেকোনো সুস্থ গণতন্ত্রে থাকতেই পারে, কিন্তু কারও শারীরিক গঠন, বাহ্যিক চেহারা বা কোনো অঙ্গহানি নিয়ে প্রকাশ্য বিধানসভায় উপহাস করা অত্যন্ত নিন্দনীয় একটি কাজ।
যে ব্যক্তিই এমন আচরণ করুন না কেন, তা কোনোভাবেই সভ্য রাজনৈতিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একজন নবাগত রাজনীতিকের কাছ থেকে এমন দায়িত্বহীন আচরণ সমগ্র রাজনৈতিক মহলের জন্যই অত্যন্ত হতাশাজনক।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য আক্রমণাত্মক কৌশল বেছে নিলেও, বিজয় সম্ভবত তাঁর সমালোচনার ভাষাগত এবং আচরণগত সীমা অতিক্রম করে ফেলেছেন।
রাজনৈতিক ময়দানে দুর্নীতি বা নীতিগত বিষয় নিয়ে আক্রমণ করা একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে উপহাস করা সাধারণত সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বিরোধী পক্ষের দিকেই পরিচালিত করে।
একজন জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে বিজয়ের বিশাল ভক্ত বাহিনী রয়েছে, যাঁদের মধ্যে তরুণ প্রজন্মের সংখ্যাই বেশি। ফলে তাঁর প্রতিটি কথা এবং আচরণ তরুণদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
এই ঘটনার পর তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং আগামী দিনগুলোতে ক্ষমতাসীন ডিএমকে ও বিজয়ের রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
আইনসভার মতো পবিত্র গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখার যে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে, তা এই ধরনের আচরণের মাধ্যমে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।